
জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হতে পারে। এবার যাঁরা হজে যেতে চান, তাঁদের এখনই প্রস্তুতি শুরু করা দরকার।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. অাবদুল জলিল জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে এ বছর ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন (এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১০ হাজার জন, অন্যরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়) বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যেতে পারবেন।
এবার কত টাকা লাগবে
সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি হজ প্যাকেজ রয়েছে। একটি প্যাকেজে হজযাত্রীর খরচ হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০৮ টাকা, অন্যটিতে খরচ হবে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা। এ ছাড়া কোরবানির জন্য প্রতিটি প্যাকেজে আরও খরচ হবে ১০ হাজার ৭৫০টাকা (৫০০ রিয়াল)।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় একাধিক প্যাকেজ রয়েছে। বেসরকারিভাবে সর্বনিম্ন খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৩৮ টাকা। এই খরচ শুধু বিমানভাড়াসহ অপরিহার্য বিষয়ের খরচ। থাকা-খাওয়া এর মধ্যে পড়বে না।
পরামর্শ
* ভাষার ভিন্নতা, নতুন দেশ, নতুন পরিস্থিতির কারণে কিছুসংখ্যক হজযাত্রী সমস্যায় পড়ে থাকেন। কয়েকবার হজ পালন করেছেন, এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কিছুটা ধারণা থাকলে, সচেতন হলে অনেক সমস্যা দূর করা যায়। পাঠকের সুবিধার্থে তাঁদের কিছু পরামর্শ:
১. সব ধরনের খরচ সম্পর্কে ধারণা রাখা: টাকা কম-বেশির ভিত্তিতে নয়, প্যাকেজের সুবিধাদি দেখে, শুনে, বুঝে চুক্তি করবেন। বিমানভাড়া, বাসাভাড়া, হজের সময় মিনায় তাঁবুতে বা আজিজিয়ায় থাকা কিংবা না–থাকা ইত্যাদি আগে থেকে জেনে নিতে হবে।
২. হজ প্যাকেজ: হজ প্যাকেজ কত দিন, সৌদি আরবে অবস্থানের মেয়াদ কত দিন, কোথায় কত দিন অবস্থান এবং তা কীভাবে, বিস্তারিত জানতে হবে। গত কয়েক বছর কত নম্বর মোয়াল্লেমের অধীনে ওই এজেন্সি হজ পালন করছে, তা জানতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশের জন্য ১ থেকে ১১৫টি মোয়াল্লেম রয়েছে। মোয়াল্লেম ক্লাস্টারের দাম অনুযায়ী জামারা (শয়তানকে পাথর মারার স্থান) থেকে মিনার তাঁবুর দূরত্ব নির্ভর করে। মোয়াল্লেম অতিরিক্ত সেবা খরচ দিয়ে কী কী সেবা পাবেন, তা লিখিত নিন। এটা নিয়ে মিনায় বির্তক হয়।
৩. মক্কা-মদিনায় বাসার অবস্থান: মক্কায় বাসার ধরন এবং তা কাবা শরিফ থেকে কত দূরে, বাসায় লিফট আছে কি না, বাসার প্রতি কক্ষে কতজন এবং বাথরুম কতজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, জেনে নেবেন। একই কথা মদিনার বাসার জন্য প্রযোজ্য।
৪. খাবার: সৌদি আরবে পৌঁছে তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে কি না বা বিকল্প ব্যবস্থা কী, তা জানতে হবে।
৫. কোরবানি: প্রতারণা এড়াতে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবির কুপন কিনে দেওয়া ভালো। এর বাইরে নিজে অথবা এজেন্সির লোক ছাগল কিনে কোরবানি দেবেন অথবা কোরবানি সম্পর্কে হাজি কীভাবে নিশ্চিত হবেন, তা-ও আগে থেকে জেনে নিতে হবে।
৬. মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা: হজের সফরে প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়। চাইলে যখন-তখন যানবাহন পাওয়া যায় না। এটাও মাথায় রাখা। ওমরাহে তাওয়াফ, সাঈ, মিনা, জামারাতের পাথর মারা, মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে হজের তাওয়াফ, সাঈ করতে প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়। এসবের জন্য মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা জরুরি।
৭. ফিতরা: ফিতরা বা স্থানান্তর (অর্থাৎমক্কার বাসা কাবা শরিফের কাছে-দূরে একাধিকবার বদল করাকে ফিতরা বলে) আছে কি না। হজের আগে না পরে ফিতরা হবে, তা জানতে হবে।
৮. হজের দিনগুলো: মিনা, আরাফাতে খাবার, যাতায়াত, মক্কায় তাওয়াফ, সাঈ করতে যাওয়ার বিষয়ে কী ব্যবস্থা এবং মোয়াল্লেম কী কী সুবিধা দেবেন, তা-ও বিস্তারিত জেনে নেবেন। আপনার সঙ্গী যদি অসুস্থ বা দুর্বল হন, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থাও জেনে নিতে হবে।
৯. হজের নিয়মকানুন জানা: প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক, হজ গাইড সংগ্রহ করে পড়ুন। (www.prothomalo.com/hajj) ওয়েবসাইটে হজের খবর সারা বছর পাওয়া যায়। গত ১০ বছর ধরে প্রথম আলো হজযাত্রীদের সহায়ক হজ গাইড প্রকাশ করে বিনা মূল্যে তা বিতরণ করছে। এটি প্রথম আলোর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।
১০. ঘোষিত হজ প্যাকেজের চেয়ে কম টাকায় হজে গেলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনোভাবেই মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল বা তথাকথিত মোয়াল্লেমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবেন না। কোন কোন এজেন্সির বিরুদ্ধে সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ রয়েছে, তা যাচাই করুন।
* সৌদি আরবের টিভি চ্যানেলে ২৪ ঘণ্টা মসজিদে নববী ও কাবা শরিফে তাওয়াফ সম্প্রচার করে, সম্ভব হলে ওই সব চ্যানেল দেখলে আগে থেকে ওমরাহ, তাওয়াফ, মসজিদের ঐতিহাসিক স্থানগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।
* ছাপানো অথবা ইন্টারনেটে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাতের মানচিত্র পাওয়া যায়। সম্ভব হলে মানচিত্র দেখুন, তাহলে ওখানকার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন।
* সম্ভব হলে নিজের পাসপোর্ট নিজে করান। কাউকে দিয়ে করালেও আপনার নাম-ঠিকানা পাসপোর্টে ঠিক আছে কি না, যাচাই করে নিন।
* হজসংক্রান্ত নিয়মকানুন জানুন। প্রয়োজনে যাঁরা হজে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন।
* সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনে হজযাত্রীদের দশ আঙুলের ছাপ, স্বাস্থ্যতথ্য (মেডিকেল ফাইল) দিতে হবে।
* মাহরাম (স্বামী, বাবা, আপন ভাই, আপন চাচা-মামা, ছেলে ইত্যাদি) ছাড়া নারী হজযাত্রী এককভাবে হজে গমনের যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
* হজের কোনো বিষয়ে বিভিন্নতা দেখলে ঝগড়া করবেন না। আপনি যে আলেমের ইলম ও তাকওয়ার ওপর আস্থা রাখেন, তাঁর সমাধান অনুযায়ী আমল করবেন। তবে সে অনুসারে আমল করার জন্য অন্য কাউকে বাধ্য করবেন না।
* নিবন্ধন তালিকায় নাম ও ক্রমিক নম্বর থাকলে (৩০ মার্চের মধে্য) হজ প্যাকেজের সব টাকা পিরশোধ করতে হবে।
* হজযাত্রীদের প্রাক্-নিবন্ধন, নিবন্ধন এবং সর্বশেষ নির্দেশনা, সংবাদ ও প্রয়োজনীয় ফরম ডাউনলোড করা যাবে (www.hajj.gov.bd) ঠিকানায়।
* যাত্রার শুরুতে ভালো সফরসঙ্গী খুঁজে নেবেন, যাতে নামাজ আদায় করতে ও চলাফেরায় একে অন্যের সাহায্য নিতে পারেন।
খরচের খাত
প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য বিমানভাড়া ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৪ টাকা, জেদ্দা-মক্কা-মদিনা-মিনা-আরাফাতে যাতায়াত ব্যয়, মিনায় তাঁবুভাড়া ও মোয়াল্লেম ফি ২৩ হাজার ৪১৪ টাকা,
সিটি চেক ইন (লাগেজ পরিবহন) খরচ ১ হাজার ৯৩৫ টাকা, জমজম পানি ৩২২ টাকা, ব্যাংক গ্যারান্টি ১ হাজার ৪৬২ টাকা, স্থানীয় সেবামূল্য ৮০০ টাকা, হজযাত্রী কল্যাণ তহবিল (আপৎকালীন তহবিল) ২০০ টাকা, হজ প্রশিক্ষণ ফি ৩০০ টাকা, ব্যাগ বাবদ ২ হাজার ৫০০ টাকা।
এ ছাড়া মক্কা-মদিনায় বাড়িভাড়া, খাবার খরচ, মোয়াল্লেমের অতিরিক্ত সেবা খরচ, ট্রেনভাড়া, হজ গাইড ও কোরবানির খরচ প্যাকেজ অনুযায়ী ঠিক করে থাকে।
প্রাক্-নিবন্ধন বাতিল করতে চাইলে
প্রাক্-নিবন্ধনের জন্য অগ্রিম টাকা প্রদান করে যদি কেউ হজে না যান, তাহলে প্রসেস ফি ৩ হাজার টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। টাকা জমা দেওয়া ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে।
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এজেন্সিগুলোর সংগঠন হলো হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। হাবের ওয়েবসাইট (www.haab-bd.com) ঠিকানা: সাত্তার সেন্টার (১৬তম তলা), হোটেল ভিক্টোরি, ৩০/এ নয়াপল্টন, ভিআইপি রোড, ঢাকা।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন
জাতীয় পরিচয়পত্রে কোেনা ভুল বা সংশোধন
করতে (www.nidw.gov.bd) ঠিকানায় তথ্য পাওয়া যাবে।
পাসপোর্ট বানাবেন যেখানে
হজযাত্রীরা নিজ নিজ জেলা অনুযায়ী পাসপোর্ট কার্যালয় থেকে ওই জেলায় বসবাসকারীরা এমআর পাসপোর্ট বানাতে পারবেন। আবেদনপত্রসহ আরও তথ্য (www.passport.gov.bd) ঠিকানায় পাওয়া যাবে।
মোয়াল্লেমের অতিরিক্ত সেবা ফি
(মিনা–আরাফাতে খাবার, তাঁবুতে বিছানা, বালিশ ইত্যাদি সেবা পাওয়া যায়)
মোয়াল্লেম নম্বর হাজিপ্রতি খরচ
১ থেকে ৯ ২,৬০০ রিয়াল
১০ থেকে ২২ ১,৬০০ রিয়াল
২৩ থেকে ৫৯ ৮৫০ রিয়াল
৬০ থেকে ১১৫ ৫০০ রিয়াল
*২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী
বিভিন্ন সেবা ও পরিবহন ফি: (মোয়াল্লেম ফি ১০৮৯ রিয়াল নামে পরিচিত ছিল) মোয়াচ্ছাসা (মোয়াল্লেমের সমিতি) সেবা খরচ ২৯৪ রিয়াল, মিনা–আরাফাতে তাঁবুভাড়া ৩০০ রিয়াল, সৌদি আরবে বাসভাড়া ৪৯৫ রিয়াল।
এবার হজ প্যাকেজে যুক্ত হয়েছে
* নিবন্ধন তালিকায় নাম ও ক্রমিক নম্বর থাকলে হজ প্যাকেজের সব টাকা দেবেন।
* পাসপোর্টে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর থাকতে হবে। ভিসা–জটিলতা এড়াতে পাসপোর্টের তথ্য পাতায় অযথা পিন লাগানো বা ছিদ্র করবেন না।
* মদিনায় ৮ দিন অবস্থান চাঁদ ওঠার তারতম্যের জন্য কম–বেশি হতে পারে।
* গড়ে ৪৫ জনের জন্য একজন গাইড, গাইডকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
* নিবন্ধন সনদে মাহরাম ও দলের সবাই একই ভাউচারে থাকলে ভ্রমণ একসঙ্গে হতে পারে। ভিন্ন ফ্লাইটে যেতে চাইলে আলাদাভাবে নিবন্ধন করবেন।
মাধ্যম
সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ দুটি। একটিতে খরচ ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০৮ টাকা। অন্যটিতে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ন্যূনতম খরচ ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা। এর চেয়ে কম টাকায় গেলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রাক্–নিবন্ধন
জাতীয় পরিচয়পত্র, এমআর পাসপোর্ট, রঙিন ছবি, মোবাইল নম্বর, ৩০ হাজার ৭৫২ টাকাসহ প্রাক্-নিবন্ধন করতে হবে।
আরও জানতে তথ্যসেবা কেন্দ্র ০৯৬০২৬৬৬৭০৭, (www.hajj.gov.bd)
কোটা
মোট হজযাত্রীর সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮। এ সংখ্যা অতিক্রম করলে নিয়মমেতা হজযাত্রীরা অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকবেন এবং পরবর্তী বছর হজে যাবেন।
নিবন্ধন
চলতি বছর হজে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হলে হজযাত্রীর মোবাইলে এসএমএস দেওয়া হবে। পছন্দনীয় হজ প্যাকেজের টাকা পিরশোধ সাপেক্ষে হজ এজেন্সি নিশ্চিত করলে পিলগ্রিম আইডি তৈরি হবে।
নিয়মকানুন
প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক পড়ুন। কয়েক বছর ধরে প্রথম আলো হজযাত্রীদের সহায়ক হজ গাইড প্রকাশ করে বিনা মূল্যে তা বিতরণ করছে। যাঁরা হজে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন।
হজ গাইডটি ডাউনলোড করতে ভিজিট করুন (http://bit.ly/1ITf4p6)