সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে সাড়ে চার বছর আগে পোশাক কারখানার চাকরি হারাতে হয় শিপ্রা দাসকে। নয় মাস বিছানায় কাটিয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটার সামর্থ্য হলেও চাকরিতে ফেরার আর সুযোগ হয়নি তাঁর। কিন্তু হা-হুতাশ করে সময় কাটানোর অবস্থা ছিল না পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই তরুণীর। কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। বাপ-দাদার পেশাকেই বেছে নেবেন তিনি। হাতে তুলে নিলেন কালি-ব্রাশ আর জুতা সেলাইয়ের সুঁই।
প্রথা ভেঙে পুরোদস্তুর ‘মুচি’ বনে যাওয়ার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম বাধাটা আসে পরিবার থেকেই। মা সুশীলা দাস কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না রাস্তায় বসে তাঁর মেয়ে জুতা সেলাই করবেন। তবু অটল থাকলেন শিপ্রা। প্রতিবেশীর কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার নেন। কেবল মনের জোরেই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় আরাকান সড়কের পাশে ফুলতল মোড়ে রাস্তার পাশে কালি-ব্রাশ নিয়ে বসে পড়েন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। সেটি শোনা যাক শিপ্রার মুখেই।
‘অনেক বছর এখানে থাকি বলে এলাকার অনেকেই আমাকে চেনে। প্রথম দিন যখন এই মোড়ে কালি, ব্রাশ আর সুঁই নিয়ে বসলাম, সবাই অবাক হয়ে দেখল। প্রথম দিন একজনও জুতা সেলাই করতে, কালি করাতে আসে নাই। অথচ আমার পাশে বসা কৃষ্ণ দাদা একটানা কাজ করছিলেন। পাঁচ-ছয় মাস পরে ধীরে ধীরে লোকজন আমার কাজে আস্থা রাখতে শুরু করে।’ শুরুটা যে কতটা কঠিন ছিল সেটি বোঝা যায় শিপ্রার পাশে বসে এখনো কাজ করা কৃষ্ণ দাশের কথাতেও। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই পেশায় তো কখনো কোনো মেয়ে আসার কথা শুনিনি, দেখিওনি। প্রথমে আমার অস্বস্তি লাগত। কিন্তু এখন ও আমার বোন। আশপাশের সবাই ওকে এখন সহযোগিতা করে।’
শিপ্রার কাজ কেমন? এ প্রশ্নে গত রোববার দুপুরে তাঁর কাছে জুতা সেলাই করতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মোতালেব বলেন, ‘বেশ ভালো কাজ করে। আমরা তো দুজনের (শিপ্রা দাসও কৃষ্ণ দাস) কাজের মধ্যে তফাত দেখি না।’
প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন শ টাকা আয় হয় শিপ্রার। এই টাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে না হলেও ঘর ভাড়া দিয়ে তিন বেলা খেয়েপরে বেঁচে আছে শিপ্রার পরিবার। চার ভাইবোনের মধ্যে প্রথম তিনজন পড়াশোনার সুযোগ পাননি, তাঁর ইচ্ছে ছিল ছোট বোনটি পড়াশোনা করবে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত বোনকে পড়িয়েছেনও। তবে পড়াশোনায় ইতি টেনে কিছু দিন আগে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছেন ছোট বোন সুলেখা।
শিপ্রাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মজলিশপুরে। প্রায় দুই দশক আগে বাবা রতন দাসের হাত ধরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্বগোমদন্ডী এলাকায় আসে তাঁরা। কখনো মুচি, কখনো শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন বাবা। সংসারে একটু স্বাচ্ছন্দ্য আনতে ২০০১ সালে কৈশোরেই বড় বোনের সঙ্গে পোশাক কারখানায় কাজ নেন শিপ্রা। কয়েক বছর পর বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায়। ২০০৯ সালে পরিবারের পছন্দে বিয়ে হয় শিপ্রারও। কিন্তু স্বামীর বাড়ি গিয়ে জানতে পারেন, আগে আরও তিনটি বিয়ে করেছেন স্বামী। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় মারধরের শিকার হতে হয় তাঁকে। পরে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। বাবাও তখন অসুস্থ। পরিবারের দায়িত্ব নিতে আবারও পোশাক কারখানায় কাজ নেন।
২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় হঠাৎ এলোমেলো হয়ে যায় শিপ্রার জীবন। পিঠাপিঠি জন্ম নেওয়া ছোট ভাইও বছর খানেক পর বিয়ে করে বাবা-মাকে ছেড়ে আলাদা সংসার পাতেন। এরপর শিপ্রা সিদ্ধান্ত নেন, আর ঘরে বসে থাকবেন না। কারও কাছে হাতও পাতবেন না। রাস্তায় বসে কাজ করা নিয়ে এতটুকু গ্লানি নেই তাঁর। এখন স্বপ্ন দেখেন, ছোট একটি দোকান হবে তাঁর। যেখানে কাজের পাশাপাশি জুতা বিক্রিও করবেন।
একটা সময় মনে কষ্ট থাকলেও এখন আর শিপ্রার ওপর রাগ নেই মা সুশীলা দাসের। শিপ্রার সঙ্গে তাঁর ঘরে গিয়ে দেখা মিলল মায়ের। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা তো আমাদের দেখে না। শিপ্রাই মাথার ছায়া।’ মায়ের কথা শুনে শিপ্রা বললেন, ‘মেয়ে হইছি তো কী হইছে? কাজ তো কাজই। ভিক্ষা করে খাওয়ার চেয়ে রোজগার করে খাওয়া অনেক সম্মানের। আমার পা ভাঙছে ঠিক, মন ভাঙতে পারে নাই।’