‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না’ বলা সেই ইকবাল, বিপ্লব সরকারসহ ৬ পুলিশ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না’ বলে আলোচিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। ছয়টি পৃথক প্রজ্ঞাপনে আরও পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে একই শাস্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

অন্য পাঁচ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপকমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক সহকারী কমিশনার মো. গোলাম রুহানী এবং কক্সবাজারের উখিয়ায় ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ বুধবার ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়েছে, তাঁরা বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় এ ধরনের অনুপস্থিতিকে ‘পলায়ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজী আশরাফুল আজীম ও রাজন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেদিন থেকে অনুপস্থিত, সেদিন থেকেই তাঁদের চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনকে বর্তমানে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত পুলিশ সুপার এবং ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ইকবাল হোসাইন ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার পাশাপাশি ই-মেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি।

এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় পার হলেও তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি; জবাব দেওয়ার জন্য সময়ও চাননি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগ তদন্ত করে ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন।

তদন্ত প্রতিবেদনসহ অন্যান্য নথি পর্যালোচনার পর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও ইকবাল হোসাইন জবাব দেননি। সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে তাঁকে চাকরি হতে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে একই অভিযোগে গত বছরের ২৩ জুলাই ইকবাল হোসাইনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল সরকার। সাময়িক বরখাস্তের এক বছরের বেশি সময় পর এবার তাঁকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হলো।

যে বক্তব্যে আলোচিত হয়েছিলেন ইকবাল

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতা হতাহতের ঘটনা ঘটছিল। ওই সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন ইকবাল হোসাইন। সেই কথোপকথনের ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

ভিডিওতে ইকবাল হোসাইনকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’

ভিডিওতে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলমকেও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের সামনে মুঠোফোনে একটি ভিডিও দেখিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ কথা বলছিলেন ইকবাল।

তবে জুলাই আন্দোলনের ঘটনা কিংবা ভাইরাল হওয়া ওই বক্তব্যকে ইকবালের চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা ‘পলায়নের’ অভিযোগেই তাঁকে বরখাস্তের কথা বলা হয়েছে।

চাকরিচ্যুত অন্য পাঁচ কর্মকর্তা

কাজী আশরাফুল আজীম ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ছিলেন। বদলির আদেশের পর ১৪ আগস্ট তিনি ডিএমপির দায়িত্ব ছাড়লেও চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে যোগ দেননি। ওই দিন থেকেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষকে মৌখিক বা লিখিতভাবে না জানিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। ওই তারিখ থেকেই তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরেক সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীও সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। কর্মস্থলে হাজির হওয়ার জন্য একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি ফেরেননি। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট থেকে অনুপস্থিত থাকায় ওই দিন থেকেই তাঁর চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।

এপিবিএনের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস কক্সবাজারের উখিয়ায় ৮ এপিবিএনে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছিলেন। ছুটি শেষে ৩১ ডিসেম্বর কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি ফেরেননি। তদন্তে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম রুহানী ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব হিসেবে প্রেষণে যোগদানের উদ্দেশ্যে ডিএমপির দায়িত্বভার ছেড়ে দেন। পরে তাঁকে খাগড়াছড়ির এপিবিএন ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে অনুপস্থিত থাকায় ওই দিন থেকেই তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।