অপেরা হাউস চত্বরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ও নববর্ষের বর্ণাঢ্য প্ল্যাকার্ড হাতে প্রবাসী নারীরা। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬
অপেরা হাউস চত্বরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ও নববর্ষের বর্ণাঢ্য প্ল্যাকার্ড হাতে প্রবাসী নারীরা। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬

সিডনির অপেরা হাউসে বাঙালির বৈশাখ উদ্‌যাপন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবারের নীল জলরাশির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্ব স্থাপত্যের বিস্ময় সিডনি অপেরা হাউসে ইতিহাস গড়লেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় এই প্রথম সেখানে উদ্‌যাপিত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘বৈশাখী উৎসব ও আনন্দ’। হাজার মাইলের দূরত্ব ঘুচিয়ে সিডনির আইকনিক এই স্থাপত্য যেন হয়ে উঠেছিল একখণ্ড বাংলাদেশ। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকাকে তুলে ধরার আনন্দে মেতে উঠেছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে লাল-সবুজের এই উদ্‌যাপন ছিল মনোমুগ্ধকর, যা সিডনির বুকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বলিষ্ঠ পদচিহ্ন হয়ে থাকবে। বর্ণাঢ্য এই উৎসবে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রবাসী বাঙালিরা তাঁদের শিকড়কে তুলে ধরেন।

ঐতিহাসিক এ আয়োজনে শুভেচ্ছাবাণী পাঠান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। বাণীতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অসামান্য অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনসের উপস্থিতি। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখে উচ্ছ্বসিত মিনস বলেন, ‘সিডনির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে বাংলাদেশিরা এখন এক অপরিহার্য শক্তি। অপেরা হাউসের এ আয়োজন বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থানেরই প্রমাণ।’

বৈশাখ উদ্‌যাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব ছিল সিডনিপ্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীদের কণ্ঠে বাংলা গান। বাংলা গানের সুর যখন অপেরা হাউসের হলের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আয়োজকেরা জানান, আসনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি আবেদন জমা পড়ায় লটারির মাধ্যমে টিকিট বণ্টন করতে হয়েছে। হলের প্রতিটি কোণ ছিল দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ।

আয়োজকদের সামনের সারির একজন আবু রেজা আরেফিন বলেন, ‘আজ আমাদের স্বপ্ন সত্যি হলো। সিডনি অপেরা হাউসের মতো জায়গায় আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা দীর্ঘদিনের সাধনা ছিল। বাঙালির এই মিলনমেলা প্রমাণ করেছে, প্রবাসে থাকলেও হৃদয়ে সব সময় বাংলাদেশ থাকে। দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়া দেখে আমরা সত্যিই অভিভূত।’

সিডনি হারবারের সেতুর সামনে বৈশাখী সাজে সজ্জিত হয়ে ‘শুভ নববর্ষ’ প্ল্যাকার্ড হাতে উচ্ছ্বসিত প্রবাসী বাংলাদেশি নারীরা। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬

জন্মভূমি মিডিয়া অ্যান্ড কালচার, বাংলাদেশ লেডিজ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশ প্রেস মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল ক্লাব অস্ট্রেলিয়ার যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সিডনিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মিহির রায় বলেন, ‘আজকের রাতটি সিডনিপ্রবাসী বাঙালিদের জন্য এক গর্বের অধ্যায়। অপেরা হাউসের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে যখন বাংলা গান বাজে, তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।’

অপেরা হাউসের অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনসের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬

অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া আরেক প্রবাসী মাবরুকা রহমান বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশিরা আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল। আমাদের রান্না থেকে শুরু করে গান—সবই এখন মূলধারায় স্বীকৃতি পাচ্ছে।’

অপেরা হাউসে আয়োজিত বৈশাখী উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশ। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক খাতে প্রবাসীরা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সিডনি ও মেলবোর্নের মতো শহরগুলোতে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলো এখন স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। অপেরা হাউসে বৈশাখী উৎসবের এ আয়োজন মূলত সেই সাফল্যেরই বহিঃপ্রকাশ।