তারেক রহমান
তারেক রহমান

বিএনপির ইশতেহার

কৃষি খাতে সেচসুবিধা বাড়াতে খাল খনন

কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বাড়াতে ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের অঙ্গীকার করেছিল বিএনপি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আজ সোমবার শুরু হচ্ছে সেই খাল খনন কর্মসূচি।

সরকারের তিন মন্ত্রণালয়ের চারটি সংস্থা প্রথম ধাপে ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করবে। এ কাজ করা হবে বিদ্যমান প্রকল্পের আওতায়। পাশাপাশি নতুন প্রকল্প নেওয়ার কাজ চলছে।

আজ সকালে দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলায় সাহাপাড়া খাল খননের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সময়ে দেশের ৫৪টি জেলায় একই কর্মসূচি শুরু হবে। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। বিএনপি এবার তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনর্বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল ও তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।

খননটাই কি উদ্দেশ্য, নাকি উপায়। উপায় যদি হয়, তাহলে আমি কী অর্জন করতে চাচ্ছি, সেটা পরিষ্কার করতে হবে। উদ্দেশ্যটা ঠিক করতে পারলে খনন, পুনঃখননটা কাজে আসবে।
আইনুন নিশাত, পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ

বিএনপি গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে জয়ী হয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। এরপরই খাল খনন নিয়ে কাজ শুরু হয়। ৯ মার্চ এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সভা করেছে চার মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৩১৮ কিলোমিটার, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ৪৫৮ কিলোমিটার, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা (বিএমডিএ) ১১ কিলোমিটার ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৪১৭ কিলোমিটার খান খনন করবে।

পাঁচ বছরে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননে আগামী বছর থেকে এ চার সংস্থার পক্ষ থেকে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে কোন সংস্থা কত কিলোমিটার খাল খনন করতে পারবে, সেটা নির্ধারণে কাজ চলছে।

পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী (মনিটরিং) মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মূলত সেচসুবিধার আওতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানো, পানিধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, খালের উৎস থেকে নদী পর্যন্ত পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা—সর্বোপরি কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত করবে এ খাল খনন কর্মসূচি। আসন্ন বর্ষার আগেই প্রাথমিক ধাপে খননের কাজ সম্পন্ন করে ফেলা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভরাট হয়ে গেছে খাল

খাল খননসংক্রান্ত সরকারি নথিতে দেশে মোট খালের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য পাওয়া যায়নি। কত খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও নেই। তবে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের নথি থেকে বিএডিসির খনন করা খালগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, বিএডিসি গত ২৫ বছরে ১৪ হাজার ৬২০ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ভরাট এবং পুরো ভরাট হয়ে গেছে ৯ হাজার ৩৭০ কিলোমিটার খাল। বাকি ৫ হাজার ২৫০ কিলোমিটার সচল আছে।

কৃষিসচিব বৈঠকে বলেন, খাল খনন টেকসই করতে হলে খালের উৎস ও শেষ অংশের মধ্যে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। চারটি সংস্থা খাল খননের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তাতে দ্বৈততা পরিহারে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সভায় নতুন প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দুই মাসের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন শেষে ডিসেম্বর থেকে খাল খননের কাজ শুরু করা যায়।

আন্তমন্ত্রণালয়ের সভার আগে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সভাপতিত্বে ২৪ ফেব্রুয়ারি আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে খাল খনন কর্মসূচি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে। সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী আগামী চার বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ শেষ করতে চান বলে সভাকে অবহিত করেন।

নতুন প্রকল্পে কত খাল খনন

২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘দেশব্যাপী নদী–নালা–খাল, জলাধার ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির ওপর অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে কোন সংস্থা কত কিলোমিটার খাল খনন করবে, তার একটা রূপরেখা হাজির করা হয়।

বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান প্রকল্পের অধীন ৭ হাজার ৪০২ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। নতুন প্রকল্প নিয়ে খনন করা হবে ১২ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার খাল। খাল শুধু খননযন্ত্র বা এক্সক্যাভেটর দিয়ে নয়, স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে খননের সিদ্ধান্তও আছে, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খনন করা খালের দুই পাশে ফল গাছ রোপণ করা এবং খনন করা মাটি যাতে আবার খালে না পড়ে, তা নিশ্চিতের নির্দেশ দেন।

খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, খাল খনন একটি টেকনিক্যাল (কারিগরি) বিষয়। এটার একটি ডিজাইন (নকশা) দরকার। ডিজাইন করা ছাড়া নাট–বল্টু জোড়া দিলে তো গাড়ি হবে না। তিনি বলেন, ‘মূল বিষয়টা হচ্ছে এখানে অবজেক্টিভসটা (লক্ষ্য, উদ্দেশ্য) কী, সেটা ক্লিয়ার (পরিষ্কার) করতে হবে। খননটাই কি উদ্দেশ্য, নাকি উপায়। উপায় যদি হয়, তাহলে আমি কী অর্জন করতে চাচ্ছি, সেটা পরিষ্কার করতে হবে। উদ্দেশ্যটা ঠিক করতে পারলে খনন, পুনঃখননটা কাজে আসবে।’