ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত ও কোটিপতি। নির্বাচিতদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ কোটিপতি এবং ৬৩ শতাংশের বেশি স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন। সংখ্যার হিসাবে, ৪৯ জনের মধ্যে ৩২ জনই কোটিপতি।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া ৪৯ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি।
সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের বড় অংশই সম্পদশালী বলে উঠে এসেছে টিআইবির হলফনামা বিশ্লেষণে। মোট ৪৯ প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জনই (৬৫ দশমিক ৩১ শতাংশ) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্যমান অনুযায়ী কোটিপতি। তাঁদের মধ্যে আবার আলাদাভাবে অস্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ২৫ জন এবং স্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ১৪ জন।
দলীয় ভিত্তিতে কোটিপতির সংখ্যা বিশ্লেষণ করে টিআইবি বলছে, বিএনপির ৩৬ জনের মধ্যে ২৬ জন (৭২ দশমিক ২২ শতাংশ) এবং জামায়াতে ইসলামীর নয়জনের মধ্যে পাঁচজন (৫৬ শতাংশ) কোটিপতি। এ ছাড়া জাগপা থেকে রয়েছেন একজন, তিনিও কোটিপতি। আর গড় বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার ওপরে এমন প্রার্থী আছেন ৩৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ (১৯ জন); সরাসরি ভোটে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে এই হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে মোট কোটিপতি আছেন ২৬৯ জন, যা শতকরা হিসেবে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
* ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে মোট কোটিপতি ২৬৯ জন, যা শতকরা হিসাবে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ।* সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে ৫৫ দশমিক ১৭ শতাংশই ব্যবসায়ী।* সংরক্ষিত আসনের নারীদের ২০ দশমিক ৪১ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দায় বা ঋণগ্রস্ত।* ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত, সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের গড় বয়স ৫৮ দশমিক ৫ বছর।
৬৩ শতাংশ স্নাতকোত্তর
টিআইবির বিশ্লেষণ বলছে, শিক্ষাগত যোগ্যতায় সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তুলনায় এগিয়ে আছেন। এর মধ্যে স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারীর হার ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬৩ শতাংশই স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ২৭ শতাংশ স্নাতক এবং ৪ দশমিক ১ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পাস। স্বশিক্ষিত প্রার্থীর হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পাস প্রার্থীর হার ২ দশমিক ১ শতাংশ।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জনকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৫০। এর মধ্যে ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার তিন বছর পার না হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাঁর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
সংরক্ষিত আসনের নারীদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা নির্বাচিত সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের (১১ শতাংশ) তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পেশা হিসেবে রয়েছে ব্যবসা (২২ দশমিক ৫ শতাংশ)। এ ছাড়া গৃহিণী ১২ দশমিক ২ শতাংশ, শিক্ষক ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রার্থী। চিকিৎসকদের অংশগ্রহণের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্য পেশাজীবীদের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ। বিশ্লেষণ বলছে, সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত, সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে ৫৫ দশমিক ১৭ শতাংশই ব্যবসায়ী।
২০ দশমিক ৪১ শতাংশ ঋণগ্রস্ত
সংরক্ষিত আসনের নারীদের মধ্যে নিজ নামে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে ১০০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার আছে অন্তত তিনজন প্রার্থীর; যাঁদের একজন প্রার্থীর নিজের নামেই ৫০২ ভরি স্বর্ণালংকারের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত বিপুল এই সম্পদের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের ঋণ ও দায়ের চিত্রও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ২০ দশমিক ৪১ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দায় বা ঋণগ্রস্ত। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে ঋণগ্রস্ততার হার সমান ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে সংরক্ষিত আসনের (২০ দশমিক ৪১ শতাংশ) তুলনায় সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (৫০ দশমিক ৮৪ শতাংশ) ঋণগ্রস্ততার পরিমাণ ২ দশমিক ৪৯ গুণ বেশি।
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সংরক্ষিত আসনের নারীদের গড় বয়স ৫২ দশমিক ১৭ বছর। বয়সসীমা হিসাবে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সের প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ (১৬ জন বা ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ)। এরপর ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৫৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা ১২। দল হিসেবে বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৩ জনের বয়সসীমা ৪৫ থেকে ৫৪ বছর, ১০ জনের ৫৫ থেকে ৬৫ বছর এবং ৬৫ বছরের উর্ধ্বে আছেন ৫ জন।
অন্যদিকে জামায়াতের নয়জনের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪৪ বছরের বয়সসীমায় একজন, ৪৫ থেকে ৫৪ বছরের তিনজন, ৫৫ থেকে ৬৫ বছরের দুজন এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে তিনজন। বিএনপির দুজনের বয়সসীমা ২৫ থেকে ৩৪ এর মধ্যে হলেও জামায়াতের একজনও এই বয়সসীমায় প্রার্থী হননি। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের গড় বয়স ৫৮ দশমিক ৫ বছর।
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ৫ জনের স্বামীর তুলনায় নিজের দালান বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা কম। একইভাবে জমির পরিমাণ কম আছে ৭ জনের এবং ১৪ জনের অস্থাবর সম্পদ তাঁদের স্বামীর তুলনায় কম। সংরক্ষিত আসনের নারীদের অধিকাংশের সম্পদের পরিমাণই তাঁদের স্বামীদের তুলনায় বেশি।
টিআইবি মনে করে, সংরক্ষিত নারী আসনে উচ্চশিক্ষিত এবং আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও সাধারণ আসনের মতো এখানেও সম্পদের প্রভাব এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশার আধিপত্য লক্ষণীয়, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।