সাত বছরের অপেক্ষার পর ঘরে এল সন্তান। বাবা হওয়ার আনন্দের এই সংবাদ যার সবচেয়ে আগে শোনার কথা, তিনি তখন আর নেই। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে সেই সুব্রত মণ্ডলের। তাঁর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে শুভজিৎ।
ঈদের আগের দিন খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুব্রতর স্ত্রী মুন্নী খাঁ ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। ২৩ মার্চ ছেলেকে নিয়ে নিজের নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়ি ফিরেছেন মুন্নী।
সুব্রত মণ্ডল (৩২) খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার কুমুদ মণ্ডলের ছেলে। মুন্নীর নানিবাড়ি একই এলাকায়। মুন্নীর যখন আট মাস বয়স, তখন বাবা মুন্নী ও তাঁর মাকে রেখে চলে যান। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাই বাবার মুখের আদল মনে নেই মুন্নীর। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা আবার বিয়ে করেন। মুন্নী বড় হন নানির কাছে।
২৪ মার্চ মুঠোফোনে কথা হয় মুন্নীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলেটা ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখছি শুভজিৎ।’
কুমিরের কবলে গেল প্রাণ
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর, দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন সুব্রত। ঘরে তখন টাকার টানাটানি, স্ত্রী অসুস্থ, তবু কাঁকড়া ধরতে বনে যেতেই হয়েছিল তাঁকে।
খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার ছোট নদীঘেরা বাড়ি থেকে করমজল খালের দূরত্ব খুব বেশি নয়, দুই কিলোমিটারের মতো। সেদিনও অন্য দিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন সুব্রত। ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমির আক্রমণ করে তাঁকে। ঘটনার প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর অন্য দিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন সুব্রত। ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমির আক্রমণ করে তাঁকে। ঘটনার প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সেদিনের স্মৃতিচারণা করে মুন্নী বলেন, ‘বেলা সাড়ে তিনটা বাজে, তবু মানুষটা ফিরল না। পরে শুনি কুমিরে ধরছে, লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রশাসন ও গ্রামের অন্য মানুষেরা লাশ বাড়িত নিয়ে আসে।’
সুব্রতর সঙ্গে সেদিন ছিলেন সুন্দরবন যুব সংঘের সহসভাপতি জুয়েল সরদারসহ আরও চারজন। প্রায় ২০ বছর ধরে একসঙ্গে বনজীবী হিসেবে কাজ করতেন তাঁরা।
জুয়েল প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন কাঁকড়া সংগ্রহ করে ফেরার পথে করমজল খাল পার হওয়ার সময় কুমির সুব্রতর পায়ে কামড়ে ধরে। তাঁরা চারজন কিছুক্ষণ কুমিরের মুখ থেকে সুব্রতকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। শেষে কুমিরের শক্তির কাছে হার মানেন। কুমির সুব্রতকে নিয়ে পানিতে ডুব দেয়। অনেকক্ষণ পর কুমির সুব্রতকে নিয়েই ভেসে ওঠে। জোয়ার থাকায় তখন কেউ পানিতে নামতে পারেননি। পরে ট্রলারের শব্দে কুমির মুখ থেকে সুব্রতকে ছেড়ে দেয়। বন বিভাগের কর্মীসহ অন্যরা পরে পানিতে নেমে মরদেহ উদ্ধার করেন।
আমার ছেলেটা ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখছি শুভজিৎ।মুন্নী খাঁ, সুব্রত মণ্ডলের স্ত্রী
মুন্নীর নানি অপর্ণা পাটোয়ারী একটি চায়ের দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালান। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নানির বাড়িতেই আছেন মুন্নী। তিনি বলেন, তাঁর শারীরিক জটিলতা ছিল, ডায়াবেটিসও ছিল। ঈদের আগের দিন প্রসবব্যথা উঠলে প্রথমে তাঁকে মোংলায় নেওয়া হয়, পরে চিকিৎসকের পরামর্শে খুলনায়।
বাধা পেরিয়ে ভালোবাসার স্বীকৃতি
ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সুব্রত ও মুন্নী। দুজনের দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় প্রথম দিকে এই বিয়ে সহজে মেনে নেয়নি কেউ। দুই বছরের বেশি সময় শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ পাননি মুন্নী। পরে ধীরে ধীরে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। কিন্তু সংসার স্বাভাবিক হওয়ার পর কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান সুব্রত।
সুব্রতের মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে অনেকেই মুন্নীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। সুন্দরবন নিয়ে কনটেন্ট নির্মাতা ও সুন্দরবনের বনদস্যুদের নিয়ে একসময় কাজ করা সাংবাদিক মোহসীন উল হাকিম বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা করেছেন। ২২ মার্চ মুন্নীর নবজাতক ছেলেকে দেখতে খুলনার হাসপাতালে গিয়েছিলেন মোহসীন উল হাকিম। নিজের ফেসবুক পেজে নবজাতককে কোলে নিয়ে ছবিও পোস্ট করেছেন।
আমি চাই আমার ছেলে সুস্থ থাক, কোলে থাক। বড় হয়ে ছেলে ওর বাবার মতো কাজ করুক, তা চাই না।মুন্নী খাঁ, সুব্রত মণ্ডলের স্ত্রী
জুয়েল সরদার বলেন, সুব্রত মণ্ডলের ছেলের জন্য যা যা ভালো হবে, সবাইকে তা–ই করার চেষ্টা করতে হবে।
জুয়েল আরও বলেন, শুধু সুব্রত নন, গত কয়েক বছরে কুমিরের আক্রমণে একাধিক বনজীবী মারা গেছেন। তাঁদের একজন মোশাররফ গাজী। মোশাররফের বাড়িতেই একটি ঘর করে থাকতেন মুন্নী দম্পতি। সন্তান প্রসবের আগে মুন্নীকে বাগেরহাটের মোংলা, সেখান থেকে খুলনার হাসপাতালে ভর্তি, তারপর বাড়ি ফেরা—সব সময় স্বজনদের মতো মুন্নীর পাশে ছিলেন মোশাররফ গাজীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম।
৩ লাখ টাকার সহায়তা, কিন্তু সামনে বড় অনিশ্চয়তা
সুব্রত বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে (পাস) বৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ করতে বনে গিয়েছিলেন। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, বৈধভাবে বনে প্রবেশ করে বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু হলে জেলের পরিবারকে সরকারিভাবে তিন লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
১৫ মার্চ সুব্রত মণ্ডলের মা বামনী মণ্ডলের হাতে বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ কার্যালয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী তিন লাখ টাকার চেক তুলে দিয়েছেন। মুন্নী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
তবে মুন্নীর সামনে এখন আরও বড় চিন্তা—স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ, আর ছেলের ভবিষ্যৎ।
মুন্নী বলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলে সুস্থ থাক। তবে বড় হয়ে ওর বাবার মতো কাজ করুক, তা চাই না।’