
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট ‘শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অষ্টম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন কথাসাহিত্যিক, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও আলোকচিত্রী সাদাত হোসাইন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বিদ্যুৎহীন একটি অন্ধকার গ্রামে বেড়ে ওঠা এক আলোকিত কিশোরের গল্প’।
‘অনেকেই বলেন, লিখতে হলে প্রচুর পড়তে হবে। কিন্তু আমি বলি, শুধু পড়লেই লেখক হওয়া যায় না। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যাঁরা প্রচুর বই পড়েছেন, কিন্তু একটি লাইনও লিখতে পারেন না। তাই আমার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনকে অধ্যয়ন করা। জীবনের ভাষা হলো পর্যবেক্ষণ, সংবেদনশীলতা এবং অনুভূতির গভীরতা। লেখক হতে হলে এই তিনটি জিনিস খুব গভীরভাবে বুঝতে হবে।’
পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন সাদাত হোসাইন। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচারিত হয়।
সাদাত হোসাইনের পরিচয় একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তিনি একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, আলোকচিত্রী এবং একটি প্রোডাকশন কোম্পানির সিইও। পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টি সাদাত হোসাইন সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?
উত্তরে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমি আসলে সবচেয়ে বেশি যে পরিচয়টি পছন্দ করি, সেটি হচ্ছে ‘‘স্টোরি টেলার’’। কারণ, আমার কাছে মনে হয়, সৃষ্টিশীল সব মাধ্যমই গল্প বলে। আমি যদি ফটোগ্রাফি করি, তখনো একটি ছবির মধ্য দিয়ে একটি গল্প উঠে আসে। যখন একটি উপন্যাস পড়ি, তখন সেই লেখার ভেতর দিয়ে একটি গল্প পাই। আবার একটি সিনেমা দেখলেও আমরা মূলত একটি গল্পই দেখি। এমনকি একটি পেইন্টিং, একটি স্কাল্পচার বা একটি কবিতাও কোনো না কোনোভাবে একটি গল্প বহন করে। সৃষ্টিশীলতার সব মাধ্যমের কেন্দ্রেই রয়েছে গল্প। আমি কখনো ছবি তুলেছি, কখনো সিনেমা বানিয়েছি, কখনো কবিতা বা উপন্যাস লিখেছি; এই সব মাধ্যমেই আসলে আমি গল্প বলার চেষ্টা করেছি। তাই নিজেকে সবচেয়ে বেশি গল্পকার বা স্টোরি টেলার হিসেবেই ভাবতে ভালো লাগে।’
সাদাত হোসাইনের ছেলেবেলা কেটেছে মাদারীপুরে, নানি-দাদির গল্প শুনে। সঞ্চালক এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমার ছেলেবেলা ছিল গল্পে ভরা। গ্রামে তখনো খুব বেশি বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশ অন্ধকার। গরমের সময় আমরা উঠানের মাঝখানে মাদুর পেতে বসতাম। আমাদের বাড়ি ছিল নদীর কাছাকাছি, ফুরফুরে বাতাস আসত। চারপাশে ঝিঁঝি পোকার ডাক। কখনো আকাশে থাকত বিশাল একটা চাঁদ। সেখানে দাদি আমাদের গল্প শোনাতেন। গল্প শুনতে শুনতে শুকনা ছোলা, মুড়ি কিংবা চালভাজা খেতাম। এ ছিল এক অন্য রকম মায়াময় মুহূর্ত।’
সাদাত হোসাইন আরও বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এ ধরনের মায়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমি পৃথিবীর অনেক দেশে গিয়েছি, কিন্তু গ্রামে সন্ধ্যায় মাদুর পেতে গল্প শোনার যে অনুভূতি, তা অন্য কোথাও পাইনি। দাদি গল্প বলতেন, নানি পুঁথি পড়তেন। এসব গল্প শুনতে শুনতেই আমার বড় হওয়া।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ‘এই গল্প শোনার অভিজ্ঞতা কি আপনার কল্পনাশক্তিকে প্রভাবিত করেছিল?’ সাদাত হোসাইন বলেন, ‘অনেকটাই। কারণ, ছোটবেলায় যখন গল্প শুনতাম, তখন সেই গল্পগুলো চোখে দেখতে পেতাম না বটে, কিন্তু সেগুলো কল্পনায় দেখার চেষ্টা করতাম। আমার কাছে মনে হয়, গল্প শোনা কল্পনাশক্তিকে অনেক বেশি সক্রিয় করে। আইনস্টাইনও তা–ই বলেন, কল্পনা অনেক সময় জ্ঞানের থেকেও শক্তিশালী। কারণ, জ্ঞান কেউ তৈরি করে, আর সেই জ্ঞান তৈরির পেছনে থাকে কল্পনা।’
‘আপনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, তখন আপনার সিনিয়ররা বলেছিলেন, আপনি লিখতে পারেন না। সেই সময় কী ঘটেছিল?’ সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমি দেখলাম, আমার চারপাশের মানুষগুলো অনেক পড়াশোনা করে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে, অনেকের লেখাও পত্রিকায় ছাপা হয়। তখন আমি ভাবলাম, তারা নিশ্চয়ই লেখালেখি সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানে। যখন আমি তাদের আমার লেখা দেখালাম, তারা বলল, এগুলো খুবই শিশুসুলভ লেখা। আমার মনে হয়েছিল, যেহেতু তারা লেখালেখি বোঝে, তাই তাদের মন্তব্য নিশ্চয়ই সঠিক। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার লেখা হয় না এবং সেই দিন থেকেই আমি লেখালেখি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমি আর একটি শব্দও লিখিনি।’
‘তারপর কীভাবে আবার সৃষ্টিশীলতার জগতে ফিরে এলেন?’ জানতে চাইলে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘এটা অনেকটাই মিরাকলের মতো। একটা ঘটনা আমার জীবন বদলে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগ–ডের দিন সবাই ছবি তুলছিল। কিন্তু কেউ ফটোগ্রাফার হতে চাইছিল না। কারণ, সবাই ছবির মধ্যে থাকতে চায়। তখন আমি বললাম, আমি ছবি তুলব। সেদিন আমি একটি রিকশার প্যাডেল ঘোরার ছবি তুললাম। ছবিটা ব্লার হয়ে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর হয়ে যায়। পরে সেটি একটি আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় পাঠাই এবং ছবিটির জন্য পুরস্কারও পাই। তখন মনে হলো, আমি যদি লিখে গল্প বলতে না পারি, তাহলে ছবি দিয়ে গল্প বলতে পারি।’
সঞ্চালক জানতে চান, ‘ফটোগ্রাফি থেকে আবার লেখালেখিতে কীভাবে ফিরে এলেন?’ সাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমি একটি পত্রিকায় ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করছিলাম, তখন ছবির সঙ্গে ছোট ছোট গল্প লিখতে শুরু করি। সেই ছবিগুলো ও গল্পগুলো মানুষ খুব পছন্দ করত। পরে সেই ছবি ও গল্প নিয়ে ‘‘গল্প-ছবি’’ নামে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। সেখান থেকেই আবার লেখালেখিতে ফিরে আসা।’
‘আপনার কিছু দর্শন মানুষের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এটা কেমন লাগে?’ সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, মানুষের অনুভূতিগুলো আসলে সর্বজনীন। ভালোবাসা, অপেক্ষা, কষ্ট—এসব অনুভূতি পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে একইভাবে কাজ করে। আমি যখন লিখি, তখন আসলে নিজের অনুভূতিই লিখি। কিন্তু সেই অনুভূতি অনেক মানুষের সঙ্গেই মিলে যায়। তখন তারা মনে করে, এই কথাটা তো আমারই বলার কথা ছিল। তখন লেখক আর পাঠকের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি হয়।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘আপনি বলেন লেখা শেখানো যায় না, কিন্তু আপনি অনেক তরুণের মেন্টর। এটা কীভাবে সম্ভব?’ সাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমি কাউকে লেখালেখি শেখাই না। কারণ, লেখা শেখানোর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে আমি আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি—আমি কীভাবে জীবনকে দেখি, কীভাবে একটি চরিত্র বা একটি গল্প ভাবি, কীভাবে একটি অনুভূতিকে প্রকাশ করি। এগুলো হয়তো অন্যদের কিছুটা সাহায্য করতে পারে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘অনেকেই ভাবেন বই পড়লেই ভালো লেখক হওয়া যায়। কিন্তু শুধু বই পড়লেই লেখক হয়ে ওঠা যায় না। জীবনকে অনুভব করতে হবে। জীবনের অভিজ্ঞতা আপনাকে অনেক অনুভূতি দেবে, কিন্তু সেই অনুভূতিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে ভাষা দরকার। আর সেই ভাষা শেখা যায় বই পড়ার মাধ্যমে। তাই একজন লেখকের জন্য জীবন অধ্যয়ন এবং বই পড়া—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।’