
ইংরেজি শিক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফনিক্সভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি ‘জলি ফনিক্স’–এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও প্রাক্-প্রাথমিকে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপিত হলো। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘জলি লার্নিং’–এর সঙ্গে এক বিশেষ অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাংলাদেশে চালু করেছে দেশের অন্যতম অগ্রগামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অবস্থিত জলি ফনিক্সের প্রধান কার্যালয়ে এ–সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন উইটন ও গাইডেন্সের প্রিন্সিপাল ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল্লাহ জামান এবং জলি লার্নিং ইউকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস জলি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উইটন ও গাইডেন্সের চেয়ারম্যান ও অর্থ পরিচালক মো. আব্দুল কাদের এবং জলি লার্নিংয়ের সিইও গিলবার্ট জলি।
জলি লার্নিং: বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি শিক্ষাপদ্ধতি
বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষায় ফনিক্সভিত্তিক ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নাম ‘জলি লার্নিং’। যুক্তরাজ্যে উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জলি ফনিক্সের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—৪২টি মৌলিক ইংরেজি ধ্বনির মাধ্যমে শেখানো, অ্যাকটিভিটিস, গান, গল্প ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে শেখার আনন্দ বৃদ্ধি, শিশুদের প্রাকৃতিকভাবে ভাষা শেখার সক্ষমতা কাজে লাগানো। পাশাপাশি পড়া, লেখা, উচ্চারণ এবং কথা বলা—চারটি দক্ষতার সমন্বিত উন্নয়ন।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি শিশুদের মুখস্থভিত্তিক শিক্ষার বাইরে এনে ধ্বনিভিত্তিক বাস্তব শেখার অভিজ্ঞতা প্রদান করে। ফলে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সেই সাবলীলভাবে ইংরেজি পড়তে, লিখতে ও বলতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি শিক্ষায় সঠিক উচ্চারণ, পড়া, লেখা এবং প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তোলার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ব্যাকরণ মুখস্থ করলেও বাস্তব জীবনে ইংরেজি ব্যবহারে আত্মবিশ্বাস হারায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলি ফনিক্স চালুর ফলে শিশুরা শুরু থেকেই ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড উচ্চারণ আয়ত্ত করতে পারবে। পড়ার গতি ও বোধগম্যতা বাড়বে। বানান শেখা সহজ হবে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা তৈরি হবে। এটি শুধু একটি কারিকুলাম সংযোজন নয়, বরং বাংলাদেশের ইংরেজি শিক্ষার কাঠামোতে একটি গভীর পরিবর্তনের সূচনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাপস কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জলি ফনিক্স বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষায় একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ। এটি শিশুদের উচ্চারণ, রিডিং ও ভাষাগত ভিত্তি মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’
বাংলাদেশে অফিশিয়াল স্টোর ও প্রশিক্ষণ সুবিধা
বাংলাদেশে জলি ফনিক্সের বই, শিক্ষাসামগ্রী এবং অফিশিয়াল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এখন থেকে পাওয়া যাবে নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এর জন্য চালু করা হয়েছে অফিশিয়াল স্টোর ওয়েবসাইট: www.jollylearningbd.com
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জলি ফনিক্সের অফিশিয়াল বই ও রিসোর্স সংগ্রহ করা যাবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ স্কুলগুলোর জন্য ইনস্টিটিউশনাল সাপোর্ট ও কারিকুলাম গাইডলাইন পাওয়া যাবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উইটন ও গাইডেন্স স্কুলে জলি ফনিক্সের কার্যক্রম
উইটন ও গাইডেন্স স্কুল আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ করে আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি প্রয়োগ, ইসলামিক মূল্যবোধ, হিফজুল কোরআন ও আরবি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও লাইফ স্কিল শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে উইটন ও গাইডেন্স বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী শিক্ষা–নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং ভবিষ্যতে একাধিক নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
জলি ফনিক্সের কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠান দুটির অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ জামান বলেন, ‘এই চুক্তিটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আমরা শুধু একটি নতুন প্রোগ্রাম চালু করছি না, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছি। জলি ফনিক্সের মাধ্যমে আমরা চাই আমাদের শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সঠিকভাবে ইংরেজি শিখুক। যেন তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো না করে বাস্তব জীবনে দক্ষতার সঙ্গেও ভাষাটি ব্যবহার করতে পারে।’
আব্দুল্লাহ জামান আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে। আজকের বিশ্বে ইংরেজি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি একটি দক্ষতা। আর সেই দক্ষতা আমরা শিশুদের মাঝে খুব ছোট বয়স থেকেই গড়ে তুলতে চাই।’
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ জামান বলেন, ‘উইটন এবং গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ইতিমধ্যেই শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জলি ফনিক্স যুক্ত হওয়ায় আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। ভবিষ্যতে আমরা এই প্রোগ্রামকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি বৃহৎ শিক্ষাবন্ধন গড়ে তুলতে চাই।’
জলি লার্নিং ইউকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস জলি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। এখানে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে উইটন ও গাইডেন্সের মতো দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে।’
জলি ফনিক্স একটি প্রমাণিত পদ্ধতি, যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর জীবন বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশেও এটি একইভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ক্রিস জলি।
একটি নতুন শিক্ষাগত আন্দোলনের সূচনা
এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হবে। আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও রিসোর্স সরবরাহ করা হবে। দেশের বিভিন্ন স্কুলে জলি ফনিক্স বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি শিক্ষায় একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে এমন এক সুযোগ, যা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল, আত্মবিশ্বাসী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলবে।