অবসরের পর বিচারককে প্রলোভনমূলক জায়গায় নিলে প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে: আইনমন্ত্রী

সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে ‘কনভোকেশন অ্যান্ড ওরিয়েন্টেশন: অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’ এ বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান
ছবি: প্রথম আলো

অবসরের পর কোনো বিচারককে প্রলোভনমূলক জায়গায় নিতে গেলে, ঝুলিয়ে রাখলে—এই প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে, সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই এসব যাচাই–বাছাই করে একটি স্বচ্ছ, স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে।’

সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে আজ সোমবার দুপুরে ‘কনভোকেশন অ্যান্ড ওরিয়েন্টেশন: অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে মো. আসাদুজ্জামান এ কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এখন যাঁরা বড় বড় কথা বলছেন, অবসরের পরে গিয়ে চাকরি খুঁজছেন। বিভিন্ন কমিশন…চাচ্ছেন, অবসরের পর সেখানে চাকরি করবেন, বিভিন্ন কোম্পানির চেয়ারম্যান হচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন তো।...প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসরের পরে আপনাকে কেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হতে হবে? আপনি কেন কোম্পানির বোর্ডে বসে চেয়ারম্যানগিরি করবেন? আপনি হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন, আপনি কেন কোম্পানির বোর্ডে বসে কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারদের ডিসপিউটের মধ্যে বোর্ডে বসে চেয়ারম্যানগিরি করবেন? আমরা চাই এই পেশার মান উন্নত করার জন্য—এই জায়গাগুলো আরও বেশি স্বচ্ছতার জায়গায় আনতে।’

সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে

আইনমন্ত্রী মো. আসদুজ্জামান বলেন, ‘হাইকোর্টে বিচার করতে বসে চিন্তা করবেন কোন ল চেম্বারে বেশি আর্বিটেশন আছে, অবসরের পর আমার কিছু আর্বিটেশন লাগবে।…যেমন একসময় প্রশ্ন উঠেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান বিচারপতির পদ দেওয়া হলে জুডিশিয়ারির মধ্যে একটা ধাক্কা লাগবে।...অবসরের পর কোনো বিচারককে এ রকম প্রলোভনমূলক জায়গায় নিতে গেলে, ঝুলিয়ে রাখলে—এই প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে, সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানে ধাক্কা আসবে। আমরা চাই এই সবগুলো যাচাই–বাছাই করে একটি স্বচ্ছ স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে। যাতে করে আমাদের আগামী প্রজন্ম যেমন স্পেস পায়, একইভাবে আগামী প্রজন্ম একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মেধা, সততা ও সাহস দিয়ে এই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।’

আইন কমিশনের ১৬৯টি সুপারিশের মধ্যে মাত্র আটটি নেওয়া হয়েছে

আইন কমিশন নিয়ে বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের আইন কমিশন নামে একটা কমিশন আছে। গত দুই যুগ ধরে দেড় শ কোটি টাকার ওপরে সেখানে খরচ হয়েছে। ১৬৯টি আইনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে মাত্র আটটি আইন সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর আট থেকে দশ কোটি টাকা সেখানে আমরা খরচ করছি, জনগণের টাকা। অথচ সেখান থেকে ফলাফল খুব কম।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি–বেসরকারি আটটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারী ২৫ জন ৬ মাসের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন। এটি দ্বিতীয় ব্যাচ। এই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় রয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।

‘কনভোকেশন অ্যান্ড ওরিয়েন্টেশন: অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’ এ মঞ্চে বসে আছেন আলোচকেরা

সংসদ সদস্যদের জন্য ইন্টার্ন দেওয়ার চিন্তা

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম নিয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত যে আমি ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি সংসদ সদস্যদের জন্য একজন করে ইন্টার্ন দেওয়া যায় কি না, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।...তাতে দুইটা লাভ হবে। আইন প্রণয়নের সাথে তারা সম্পৃক্ত হতে পারবে, কীভাবে আইন প্রণয়ন হচ্ছে। দ্বিতীয়ত হলো, কীভাবে রাজনৈতিক পরিবেশকে সুস্থ, পরিশীলিত এবং যুক্তিতর্কের জায়গায় আনা যায়, এমন একটা জায়গা হয়তো আমরা তৈরি করতে পারব।’

অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে আরও বেশি সংস্কার চাই

অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের আরও বেশি সংস্কার চান উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে বসার জায়গা নাই, খুব কষ্ট হয়। এটাকে আরও কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়—এ মর্মে ইতিমধ্যেই বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য আমার অফিসকে নির্দেশ দিয়েছি।...একইভাবে বার কাউন্সিলের পরীক্ষাকে কীভাবে আরও বেশি যুগোপযোগী করা যায়। পরীক্ষা বাংলায় হয়।...বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অনেকে ব্রিলিয়েন্ট শিক্ষার্থী, যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে এসেছে, বাইরে বিদেশে লেখাপড়া করে এসেছে, তাদের জন্য একটা কঠিন বাস্তবতা পার হতে হয়। এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে কীভাবে এটি আরও বেশি যুগোপযোগী করা যায়, সে জন্য বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।’

বিয়ের বাজারেও আগামী প্রজন্মের আইনজীবীরা টপার হোক

‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি’ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এই ধারণা থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে। একসময় ছিল আইনজীবীদের কাছে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাইত না।...ইতিমধ্যে বার কাউন্সিল…নেতারা সেই জায়গা থেকে অনেকটা বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। বিয়ের বাজারে আইনজীবীদের মার্কেট ভালো ছিল না।…আমি ফেস করেছি ওটা।...আমরা চাই বিয়ের বাজারেও আমাদের আগামী প্রজন্মের আইনজীবীরা টপার হোক। আমরা এমন একটি পেশাগত পরিবেশ তৈরি করতে চাই…পেশার মান আমরা উন্নত করতে চাই।’

এমন আইনজীবী চাই যাঁরা দেশের জন্য অবদান রাখবেন

উন্নত করতে হলে শুধু মুখে কথা বললে হবে না স্মরণ করিয়ে দিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পরশু দেখলাম একজন সিনিয়র বিচারক ছিলেন, উনি ওকালতিতে ফিরে এসেছেন। মক্কেলের কাছ থেকে সোয়া এক কোটি টাকা নিয়েছেন...তা–ও কি চেকে নিয়েছেন উনার নামে। মক্কেলকে ইতিবাচক ফলাফল দিতে পারেননি, টাকাও ফেরত দেননি। মক্কেল সম্ভবত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে অভিযোগ করেছেন। আমরা এ রকম আইনজীবী চাই না, এ রকম নীতি কথা বলা আইনজীবী চাই না। আমরা চাই এমন আইনজীবী, যাঁরা বাংলাদেশের জন্য কনট্রিবিউট (অবদান) রাখতে পারেন।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য দেন। সঞ্চালনায় ছিলেন ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের পরিচালক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাসনুভা শেলী এবং ইউএনডিপির (বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার ও নিরাপত্তাবিষয়ক) সিনিয়র উপদেষ্টা রোমানা সোয়াইগার।

অনুষ্ঠানে প্রথম ব্যাচে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের হাতে সনদ তুলে দেন আইনমন্ত্রীসহ অতিথিরা। দ্বিতীয় ব্যাচে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের শপথবাক্য পাঠ করান অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ।