হামের উপসর্গে মৃত সন্তানের কপালে মাথা রেখে মায়ের কান্না, পাশে বিহ্বল বাবা
হামের উপসর্গে মৃত সন্তানের কপালে মাথা রেখে মায়ের কান্না, পাশে বিহ্বল বাবা

প্রতিক্রিয়া

‘হে শিশু, আমাদের ক্ষমা করো’

হাম। যে রোগটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, সেই রোগই এখন শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একের পর এক ছোট ছোট মুখ, যাদের অনেকেই এখনো ঠিকমতো ‘মা’ ডাকতে শেখেনি, পৃথিবীর রং ভালো করে দেখতেও পারেনি—তাদের জীবন থেমে যাচ্ছে জ্বর, কাশি, লালচে দাগ আর শ্বাসকষ্টের মধ্যে।

মৃত্যুর সংখ্যা এখন শুধু একটি সংখ্যা নয়। ১০০, ২০০, ৩০০—এভাবে গুনতে গুনতে ৪৯৯। একসময় সেটি ৫০০-তে পৌঁছাবে। আর তখন হয়তো কোথাও কোনো হাসপাতালের বিছানায়, কিংবা কোনো গ্রামের মাটির ঘরে, কোনো মা বা বাবা তাঁদের শিশুর কপালে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলবেন, ‘আর একটু চোখ খোলো বাবা।’

কিন্তু শিশুটি আর চোখ খুলবে না।

ভাবলে শিউরে উঠতে হয়—এই শিশুগুলোর অপরাধ কী ছিল?

তারা তো রাজনীতি বোঝেনি। টিকাদান কর্মসূচির ফাইল কোথায় আটকে আছে, তা জানত না। এ নিয়ে দেনদরবারে কী সমস্যা হয়েছিল, তা তাদের জানাও নেই। তারা শুধু জন্মেছিল এই পৃথিবীতে একটু বড় হবে বলে। স্কুলে যাবে, নতুন জামা পরবে, বৃষ্টিতে ভিজবে, বাবা অথবা মার আঙুল ধরে হাঁটবে—এই ছিল তাদের স্বপ্ন। অথচ তাদের ভাগ্যে জুটল হাসপাতালের অক্সিজেন মাস্ক আর সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিথর শরীর।

হামে শিশুমৃত্যুর দায়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিচারের দাবিতে এমন কর্মসূচি পালিত হয়

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, যারা বাংলাদেশকে টিকা দিয়ে সহযোগিতা করে, তারা বারবার সতর্ক করেছে। তারা এখন স্পষ্ট করে বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে গাফিলতি হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটেছে। যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলার টিকা পাওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকেই সেই সুরক্ষা পায়নি। আর সেই ফাঁক গলেই ফিরে এসেছে হাম।

কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ কথা বলছেন, পত্রিকায় বিবৃতি দিচ্ছেন, কলাম লিখছেন, সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, ‘এটি বৈশ্বিক প্রবণতা।’ যেন এই মৃত্যুগুলো কোনো অবধারিত পরিসংখ্যান, কোনো প্রশাসনিক ফুটনোটমাত্র।

হ্যাঁ, এটা সত্য—শুধু বাংলাদেশেই এ বছর হাম বাড়েনি। বিশ্বের নানা দেশেই এর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, অনেক দেশ বহু বছর ধরেই এই রোগের সঙ্গে লড়ছে। বাংলাদেশে ছিল ভিন্ন এক গল্প।

এই দেশ হাম নির্মূলের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

গ্রামের পর গ্রাম, শহরের অলিগলি—স্বাস্থ্যকর্মীরা গিয়ে শিশুদের টিকা দিয়ে এসেছেন। মায়েরা বুক ভরে বিশ্বাস করেছিলেন, অন্তত এই একটি রোগ থেকে তাঁদের সন্তান নিরাপদ।

সেই অর্জন কি তাহলে আমরা হারিয়ে ফেলছি?

একজন মা হয়তো এখনো তাঁর শিশুর টিকা কার্ড খুঁজে বের করছেন।

কার্ডে হয়তো একটি ঘর খালি। সেই দিন টিকা দিতে পারেননি—বন্যা ছিল, রাস্তা বন্ধ ছিল, কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে শুনেছেন—ভ্যাকসিন নেই।

সেই মা হয়তো ভাবেননি, সেই ছোট্ট খালি ঘর একদিন তাঁর সন্তানের জীবন আর মৃত্যুর সীমারেখা হয়ে দাঁড়াবে।

হামের উপসর্গ থাকায় চার বছরের শিশু মুসকানকে কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয় ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে। মায়ের কোলে হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে ভর্তির অপেক্ষায়। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে

ঢাকার কোনো হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন হয়তো পাশাপাশি শুয়ে আছে কয়েকটি শিশু। কারও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কেউ কেউ কাঁদার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। একেকটি বেডের পাশে বসে থাকা মা-বাবারা একে অপরের দিকে তাকান না। কারণ, সবাই একই প্রশ্নে ভেঙে পড়ছেন—‘আমার সন্তানটি কি বাঁচবে?’

কেউ বাঁচে।

কেউ আর ফেরে না।

আর যারা ফেরে না, তাদের জন্য খুব দ্রুত সবকিছু শেষ হয়ে যায়। ছোট্ট একটি জানাজা, কয়েকজন মানুষের কান্না, আর তারপর পৃথিবী আবার নিজের ছন্দে চলতে থাকে। খবরের কাগজে হয়তো একটি সংখ্যা বাড়ে—৪৯৮, ৪৯৯...

তারপর? অধুনা ডিজিটাল মাধ্যমে ফটোকার্ড এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে। সংবাদের বিশালত্ব বোঝাতে, গুরুত্ব বোঝাতে এই কার্ডের ব্যবহার হয়। ৫০০ সংখ্যা তো অনেক বড়। এখন তাই অবধারিতভাবে একটি ফটোকার্ড হবে।

যখন একটি রাষ্ট্র সময়মতো টিকা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়, যখন সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যখন দায় স্বীকারের বদলে ব্যাখ্যা খোঁজা হয়—তখন আসলে প্রতিটি অনিরাপদ শিশুর গলায় অদৃশ্য একটি নম্বর ঝুলে যায়।

কে হবে পরেরজন?

চট্টগ্রাম বা খুলনার কোনো উপকূলীয় গ্রামে জন্ম নেওয়া শিশু?

ঢাকার বস্তিতে থাকা কোনো নবজাতক?

নাকি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের এমন কোনো শিশু, যার মা এখনো জানেন না, টিকা নেওয়ার বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ একসময় দেখিয়েছিল, ইচ্ছা থাকলে একটি দেশ কীভাবে প্রতিরোধযোগ্য রোগকে প্রায় হারিয়ে দিতে পারে। সেই সক্ষমতা এখনো আছে। দরকার শুধু দায় স্বীকার, দ্রুত পদক্ষেপ, আর প্রতিটি শিশুর জীবনের মূল্য বুঝতে পারা।

কারণ, প্রতিটি শিশুই একটি পূর্ণ পৃথিবী।

একটি শিশু মারা গেলে শুধু একটি প্রাণ হারায় না; হারিয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ, তার মায়ের স্বপ্ন, তার বাবার ভরসা, তার ভাইবোনের খেলার সঙ্গী। হারিয়ে যায় সেই মানুষ, যে হয়তো বড় হয়ে শিক্ষক হতো, কবি হতো, চিকিৎসক হতো, কিংবা কেবল একজন ভালো মানুষ।

হামের এই পুনরুত্থান আমাদের জন্য শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার আয়না।

আমরা কি সেই আয়নায় তাকাতে প্রস্তুত?

চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ভ্রুক্ষেপ ছিল না কারও। তারও আগে অন্তত দেড়টি বছর ধরে টিকা দিতে নিদারুণ অবহেলা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। মার্চ মাসের দিকে যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তখন বর্তমান সরকার দোষের রাজনীতি শুরু করল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলে বসলেন, আট বছর আগে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি।

যমজ সন্তানের মধ্যে একজন মারা গেছে হামে, সে বাবার কোলে। মায়ের কোলের শিশুটি হামে আক্রান্ত। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা গেছে এই দৃশ্য

আর বক্তব্যকে খণ্ডন করে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম ৩১ মার্চ। সেখানে দেখিয়েছিলাম, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী যে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১২ মাস বয়সী শিশুদের হামসহ নানা টিকাদানের হার ছিল সর্বনিম্ন ৮৯ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০৩ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল ২০১৮ সালে। আর সর্বোচ্চ ছিল ২০২২ সালে—১০৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

কিন্তু ২০২৪ সালে টিকাদানের হার কমে যায়, নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ হার অনেক কমে গিয়ে হয় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চালু ছিল এবং টিকাদানের উচ্চহার বজায় ছিল অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টিকাদানের এসব নথি সরিয়ে ফেলে ওয়েবসাইট থেকে। কারা করল এই কাজ?

বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীর কথায় ইঙ্গিত মিলছে, তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়মুক্তি দিতে চায় টিকাদানের এই ব্যর্থতা থেকে। মাঝেমধ্যে একটু বিরোধিতা করে কথা বলতে হয়, তাই বলা।

কিন্তু সত্য চাপা থাকে না। বাংলাদেশকে টিকার কাজে সহযোগিতা করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেন, টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি এবং এর মাধ্যমে রোগের প্রাদুর্ভাব তথা হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে তারা সতর্ক করেছিলেন।

অন্তর্বর্তীর সহযোগীরা এসব শুনে কিন্তু রণে ভঙ্গ দেননি। তাঁদের এক প্রতিনিধি বললেন, ইউনিসেফ হাম নিয়ে সতর্ক করেনি।

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা আর কতটা বলতে পারে। মস্তিষ্ক বর্গা দেওয়া মানুষের বোধ হয় সেগুলো বোধগম্য হয় না।

এসব কথা বলে লাভ নেই এখন আর। এখন একটি ছোট্ট কফিনের অপেক্ষা।

আমার ধারণা, এখনো এসব মানুষ বলে বেড়াবেন, ‘আমাদের কোনো দায় নেই।’

তবে হে শিশু, যে তুমি ৫০০তম সংখ্যা হতে যাচ্ছ, তুমি আমাদের ক্ষমা করো। তুমি তাদের ক্ষমা করো, যারা তোমাকে এই পৃথিবীটা দেখতে দিল না সুন্দর করে।