
সংবিধানে বৈষম্য নিরসন ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি যেভাবে স্পষ্টভাবে বলা আছে, জুলাই সনদে তা ততটা জোরালোভাবে আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। জুলাই সনদে বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বৈষম্য নিরসনে কী করণীয়, তা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। একই সঙ্গে সব ধরনের কোটা তুলে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। সারা হোসেন বলেছেন, সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে যেন সুরক্ষামূলক বিধানগুলো বাদ না পড়ে যায়।
‘গণ–অভ্যুত্থানের জন–আকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক এক সেমিনারে সারা হোসেন এ কথা বলেন। আজ শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আইপিনিউজবিডি ও সড়ং রিসার্চ অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার এ সেমিনারের আয়োজন করে।
জুলাই সনদে কত দূর কী পেয়েছি, সংবিধানে কত দূর কী পেয়েছি—এটা যাচাই করতে হবে উল্লেখ করে সারা হোসেন বলেন, ‘আমরা এই অবস্থা চাই না যে একটা সংশোধন করতে গিয়ে আমরা অনেক কিছু ফেলে দেব, যেগুলো আমাদেরকে আসলে সুরক্ষা দেয়। তার মধ্যে এই যে বৈষম্য নিরসন করার ব্যাপারটা, এটা যতটা জোরালোভাবে সংবিধানে এসেছে, আমার মতে এটা কিন্তু জুলাই সনদে অত জোরালোভাবে আসেনি।’
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘সংবিধানে পরিষ্কার করে বলা আছে যে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, জন্মস্থান—এসব কারণে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। পরিষ্কার করে বলা আছে, অনগ্রসর যারা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই ল্যাঙ্গুয়েজটা কিন্তু দেখছি না জুলাই সনদের মধ্যে; বহুত্ববাদ বলা হয়েছে কিন্তু বৈষম্য নিরসনে কী করণীয়, সেটা কিন্তু বলা হয়নি।’
সব ধরনের কোটা তুলে দেওয়া প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে সেমিনারে প্রশ্ন তোলেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘আর বিশেষ ব্যবস্থা যে নেওয়া যায়, কোটা যে রাখা যায়—আমরা একধরনের কোটার বিরুদ্ধে সবাই লড়াই করেছি জুলাইয়ে, কিন্তু সব ধরনের কোটা কি আসলে উঠিয়ে দেওয়া দরকার?’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ঐকমত্য কমিশন প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে ঐকমত্য (কমিশন) সে রকম একটা ঐকমত্য তৈরি করতে পেরেছে। সে জন্য জুলাই সনদকে এখন আমাদেরকে ধরেই রাখতে হবে, এটাও মনে করছি না। বর্তমান সরকার বলেছে, বিএনপি সরকার কিন্তু বলেছে যে তারা অনেক পয়েন্টে ডিসেন্ট দিয়েছে। এখন সব পয়েন্টে আপনি বা আমি ওনাদের ডিসেন্ট মানব কি না, সেটাও একটা তর্কের ব্যাপার।’
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিকে নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন সারা হোসেন। যদিও তিনি মনে করেন, সুযোগটা ইতিমধ্যে হোঁচট খেয়েছে। কারণ, বিরোধী দল কমিটিতে যাচ্ছে না। বিরোধী দলের যতটা ক্ষমতা আছে, সেটা তারা প্রয়োগ করছে না।
সারা হোসেন বলেন, ‘আমাদের হতাশ হওয়ার অনেক কারণ আছে, আমরা যে জায়গায় ছিলাম, অবশ্যই আমরা সেই জায়গাটাতে নেই। আড়াই বছর আগে ৫ আগস্টের দুপুরবেলায় যে রকম একটা আশা ছিল অনেকের জন্য—একটা চেঞ্জ আসবে, আমরা ওই স্পেসের মধ্যে এখন অবশ্যই নাই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, কমপ্লিটলি হতাশ হওয়া উচিত নয়। একেবারে যে কোনো কিছুর সমাধান হয়নি ৫০ বছরে—এটাও ভাবার কোনো দরকার নেই।’ তাঁর মতে, বিষয়গুলো নিয়ে আওয়াজ তুলতে হবে, কথা বলতে হবে। তা না হলে এখন যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, সেটা আরও শক্ত হবে।
সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটি নিয়ে সারা হোসেন বলেন, ‘এখন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাঁরা আছেন, ১৭ জন থাকার কথা, বিরোধী দল আসেনি বলে ওখানে ১২ জন আছেন। সেখানে আছেন দুজন নারী, সেখানে সবাই বাঙালি, সেখানে সবাই মুসলমান…। এখানে তো অলরেডি বহুত্ববাদের যে প্রমিস বা প্রতিশ্রুতি, এখানে রাখা হয়নি।…অন্যান্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা দেখি—সংসদের চিত্র আপনারা জানেন, ইউনিভার্সিটি, অফিস-আদালত আপনারা দেখছেন—সেখানে বহুত্ববাদের চর্চা তেমনভাবে নেই।’
সারা হোসেন বলেন, ‘অবশ্যই মানবেন্দ্র লারমা আমাদের যে স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, তা বাস্তবায়ন করার জন্য কী কী করা প্রয়োজন, তা বুঝিয়ে গেছেন, সেই কাজের মধ্যে আমাদের সবার থাকতে হবে।’
সেমিনারে কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, সংবিধানে কী লেখা থাকল বা বিশেষ কমিটিতে সংবিধান সংশোধনে কী সংযোজন-বিয়োজন হলো, তা দিয়ে কিন্তু আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত হবে না বা তাদের বঞ্চনার অবসান হবে না। এ কারণে অবশ্যই রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেমন লড়াই করতে হবে, সমাজকেও তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে মৌলিক কোনো সমস্যার সমাধান করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মৌলিক সমস্যা হচ্ছে ভূমির সমস্যা, মালিকানার সমস্যা।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রকল্পনার একটা প্রবল রূপ হচ্ছে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পনা। তার বাইরে আরেকটি আছে যে ধর্মীয় রাষ্ট্রকল্পনা। দুই ধরনের জন–আকাঙ্ক্ষা। কারণ, জন আকাঙ্ক্ষা আসলে রাষ্ট্রকল্পনা। তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রকল্পনার মধ্যে আমাদের মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭০–এর দশকে এর বাইরে একটা কিছু মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর রাষ্ট্রকল্পনাটা আমি অনুমান করি যে দুইটা জ্ঞান–ঐতিহ্য থেকে এসেছিল।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে দুই প্রতিরোধী দৃশ্যমান প্রবণতা দেখি, তার একটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ। আরেকটি হচ্ছে দেশজুড়ে গ্রাফিতি। কিন্তু সেই গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে এবং অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে যে জন–আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই জন–আকাঙ্ক্ষাকে পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য এবং একে প্রান্তিক করে তোলা হয়েছে।’
আইপিনিউজবিডির উপদেষ্টা সম্পাদক সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্য দীপায়ন খীসা, কবি ও প্রাবন্ধিক সাখাওয়াত টিপু এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বক্তব্য।