আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। ১১ আগস্ট
আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। ১১ আগস্ট

আদিবাসী দিবসের আলোচনা

‘বৈচিত্র্য হুমকি নয়, বরং শক্তি’

দেশের মানুষের বৈচিত্র্যকে বিভাজনের কারণ হিসেবে না দেখে শক্তি ও সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন আদিবাসী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভান্ডার বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা আছেন, তাঁদের এই বৈচিত্র্যকে সম্মান ও সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আলোচকেরা এ কথা বলেন। যৌথভাবে এ সভার আয়োজক বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক।

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’, যা আদিবাসীদের প্রথাগত অবদান ও অধিকার সুরক্ষাকে নির্দেশ করে।

আলোচনায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভান্ডার দেশকে বৈচিত্র্যময় করেছে। এই বৈচিত্র্য দেশের সম্পদ ও অহংকার।

উন্নয়ন ও সভ্যতার নামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং তাঁদের ভাষা-সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মালেকা বানু। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভূমিকা থাকলেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আদিবাসী নারীরা সামগ্রিকভাবে আরও নাজুক ও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন। মূলধারার নারী আন্দোলনের সঙ্গে আদিবাসী অধিকার আন্দোলন যুক্ত হলে তা আরও শক্তিশালী হবে বলেও মত দেন তিনি।

বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। ১১ আগস্ট

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, মানুষ হিসেবে সবাই সমান হলেও অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্য রয়ে গেছে। তা আদিবাসী, নারী কিংবা প্রান্তিক মানুষ—সব ক্ষেত্রেই। বাংলাদেশকে বৈচিত্র্যময় ‘রংধনু জাতি’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আরও বেশি সুন্দর, বর্ণময় হয়ে উঠবে যদি এই দেশের সব জাতিসত্তার বৈচিত্র্যের মানুষগুলোকে মর্যাদা দেওয়া যায়।

সঞ্জিব দ্রং বলেন, বৈচিত্র্যের অনেক শক্তি, এটা মাথায় রাখতে হবে। বৈচিত্র্য কোনো হুমকি নয়। এটা যেন রাষ্ট্র যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা মাথায় রাখেন।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাং। তিনি অভিযোগ করেন, আদিবাসীদের ভূমি, জ্ঞান ও পরিবেশ সংরক্ষণের যে ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বন রক্ষায় তাদের যে ভূমিকা, তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। অথচ তাদের জ্ঞানের যে বৈচিত্র্য, তা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু মূলধারার সমাজে সেই জ্ঞানকে কখনো সেভাবে লালন বা ধারণ করা হয়নি।

এখনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের জ্ঞান, খাবার, পোশাক—সবকিছুকেই এখনো অবহেলার চোখে দেখা হয়, অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবেও দেখা হয় বলে অভিযোগ করেন ফ্লোরা বাবলি তালাং। তিনি আদিবাসীদের জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে নতুন করে মূল্যায়ন করার এখন সময় এসেছে বলে দাবি জানান।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নাচ পরিবেশন করে নৃত্য শিল্পীরা। ১১ আগস্ট

সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগ ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রোগ্রামে’র ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথারিনা কোনিগ বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের যেসব সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেদিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের নিজেদের বিদ্যমান জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সংগঠিত হওয়ার পদ্ধতিগুলোর দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না। অথচ অর্থবহ অংশগ্রহণের অর্থ হলো, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজেদের জ্ঞান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য তাঁদের যথেষ্ট সুযোগ ও প্রভাব থাকতে হবে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ও তাঁদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে বৃহত্তর নাগরিক সমাজ এবং নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা। এতে আরও বক্তব্য দেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী ও মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন উজ্জ্বল আজিম প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়।