অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত ছাড়াই চলছে বহুতল ভবন নির্মাণ

সম্প্রতি গুলশানের একটি বহুতল ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা
ফাইল ছবি: সাজিদ হোসেন

ঢাকাসহ সারা দেশের সব নগরকেন্দ্রে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা উপেক্ষা এবং বিল্ডিং কোড না মেনে ১০ থেকে ১২ তলা পর্যন্ত উঁচু ভবন নির্মাণ করায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া সংকীর্ণ রাস্তার পাশে উঁচু ভবন নির্মাণ বাড়াচ্ছে আগুনের ঝুঁকি। জরুরি পরিস্থিতিতে ভারী যন্ত্রপাতিসহ ফায়ার সার্ভিসের যানবাহনের যাতায়াত বা প্রবেশকে সীমাবদ্ধ করার ফলে আরও বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান ইউএনবিকে বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনসমূহকে অবজ্ঞা করে বহুতল ভবনের নির্মাণ ও ব্যবহার চলছে। এ ছাড়া এসব ভবনে অগ্নিসহ বিভিন্ন দুর্যোগে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশের নগর এলাকায় ব্যবসায়িক লাভ বাড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্যে বিকল্প সিঁড়ি ও নির্গমন পথ, ফায়ার লিফট, ফায়ার ডোর, ফায়ার ডিটেক্টর, ফায়ার স্প্রিংক্লার, ফায়ার সাপ্রেশন সিস্টেম প্রভৃতি অগ্নিনির্বাপণ সিস্টেমের যথাযথ ব্যবস্থা না করেই বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। পরে কোনো ধরনের অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই এই ভবনগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

সারা দেশের ভবন নির্মাণে যথাযথ মানদণ্ড ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি অনতি বিলম্বে গঠন করে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান।

এই নগর-পরিকল্পনাবিদ বলেন, মানুষের জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে বহুতল ভবনসহ নগরে অগ্নি ও দুর্যোগজনিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেভেলপার ও ভবনমালিকদের দায়বদ্ধতায় নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সব নগর সংস্থাসমূহকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের বর্ষপূর্তির সময়ই গুলশানের বহুতল আবাসিক ভবনে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড হয়। নগর এলাকায় অগ্নিদুর্যোগে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কার বিপরীতে ভবনগুলোর অভ্যন্তরীণ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাহীন দুর্বলতা ও নগর সংস্থাসমূহের সার্বিক পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, নজরদারি ও আইনের প্রয়োগের দুর্বলতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে।

রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সরেজমিন তদন্তের পর বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভবনমালিক ও ডেভেলপারদের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন সঠিকভাবে করা হয়েছিল কি না, সেটাও নিশ্চিত করা যায়নি বলে মন্তব্য করেন এই নগর-পরিকল্পনাবিদ।

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশের নগর এলাকাতেই অত্যন্ত সরু রাস্তার পাশেই ১০ থেকে ১২ তলা বা ততোধিক উচ্চতার বহুতল ভবন নির্মাণ মানদণ্ড বা অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়া গড়ে উঠছে। এমনকি সম্প্রতি ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়েও ছোট রাস্তার পাশে, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশে অক্ষম, সেসব রাস্তায় বহুতল ভবনের নির্মাণ অনুমোদনের দাবিতে অনেক গোষ্ঠী ও মহলকে সরকারের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করতে দেখা গেছে। এমনকি ফায়ার-সংক্রান্ত দেশের বিদ্যমান আইনে সাততলা ভবনকে বহুতল ভবন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, ২০২০-এ ১০ তলা ভবনকে বহুতল হিসেবে বিবেচনা করবার ফলে ৭ তলার ওপর অনেক ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

তুরস্ক-সিরিয়ার সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্প দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির কারণে দেশের নগরগুলোতে ভূমিকম্পসহ সার্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতির বিষয়গুলো জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।  

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ‘ভবন নির্মাণ করতে সবাই চাই কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থায় কেউ টাকা খরচ করতে চায় না। নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ফায়ার সেফটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। শিশু বয়স থেকে ফায়ার সেফটির বিষয়ে সচেতনতা তৈরির বিনিয়োগ করতে হবে।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন আরও বলেন, কারিকুলামে এ বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। ফায়ার সেফটির বিষয়ে প্রশিক্ষণাগার তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ভবন নির্মাণের সময় গৃহীত ফায়ার সেফটি প্ল্যানের শর্ত বাস্তবায়ন করা। ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট প্রদানের আগে অগ্নিনিরাপত্তা শর্ত মানা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মতামত গ্রহণ এবং শহরজুড়ে হাইড্রেন্টব্যবস্থা স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করে ভবন নির্মাণ করলে ঝুঁকি কম থাকবে।

রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, ফায়ার সেফটি ছাড়া কোনো ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। রাজউক থেকে ভবন নির্মাণের অনুমতি নিয়েও অনেকে বিল্ডিং বিধিমালা মানছে না, ফলে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে।  

আনিছুর রহমান মিঞা আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা রাজউক থেকে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। আমাদের মনিটরিংব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে।’