
‘সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে লাইভে দেখেছি। হতভম্ব হয়েছি, ক্ষুব্ধ হয়েছি, হতাশ হয়েছি। সে রাতের ঘটনা কত ভয়াবহ ছিল, আজ না দেখলে বুঝতাম না। সেটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, জাতি হিসেবে আমাদের মাথাটা হেঁট হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের ওপরে আক্রমণ তো আমাদের জাতির বিবেকের ওপরেই আক্রমণ।’
কথাগুলো বলছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত ‘আলো’ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন তিনি। আজ বুধবার সেই প্রদর্শনী দেখতে দেখতে নিজের অনুভূতির কথা বলছিলেন তিনি।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ভবনে হামলা করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। এরপর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ এই ভবনে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী ‘আলো’।
সেই প্রদর্শনী ঘুরে দেখে রাশেদা কে চৌধূরী মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তরুণ প্রজন্ম ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা জুলাইতে দেখেছি আমাদের সন্তানেরা আত্মাহতি দিয়েছে। কিন্তু আজকে এই যে প্রদর্শনীতে যা দেখলাম, সেটি দেখে মনে হলো সম্ভবত আমাদের এই প্রবীণ প্রজন্মই আমাদের সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করতে পারিনি। তারা লেখাপড়া শিখেছে, বড় হয়েছে, কিন্তু মানবিকতা বোধটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। গণমাধ্যমের ওপরে যারা আক্রমণ করতে পারে, তাদের কাছে মানবিকতাবোধ তো প্রত্যাশা করি না। কিন্তু হতাশ হয়েছি বলতেই হবে। আজকে দেখে দুঃখটা আবার জাগরিত হলো। কিন্তু তারপরও আশা করে থাকব, আগামীর বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা আর কখনোই ঘটবে না।’
আজ বুধবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে শতাধিক দর্শনার্থী আসেন। কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউ পরিবারসহ শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখেন। এই দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছিলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের ভিডিও দেখেও যে ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেননি, এই প্রদর্শনী তা নতুন করে অনুভব করিয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপর হামলাকারীদের বিচার দাবি করেছেন তাঁরা।
আজ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। প্রদর্শনী দেখে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বললেন, ‘এটা আসলে আমাদের জাতির লজ্জা যে একটা গণমাধ্যমের ওপর আমাদের নিজের দেশের মানুষ এমন হামলা করেছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আশা করব, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি না হয়। কোনো গণমাধ্যমে যেন এমনটা না হয়। মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করবে, কিন্তু প্রকাশ করার একটা রাস্তা আছে। এটা যে ধ্বংসাত্মকভাবে করতে হবে, এটা আমরা কখনোই সমর্থন করি না।’
অঞ্জন চৌধুরী বলছিলেন, ‘যদি কারও কোনো গণমাধ্যমের সম্বন্ধে কোনো কিছু থাকে বা সমালোচনা থাকে, সেটা আমরা আমাদের ভাষার মধ্য দিয়েই বলতে পারি। কিন্তু এই যে ধ্বংসযজ্ঞ, এটা আমাদের জন্য আমাদের জাতির জন্য একটা লজ্জাকর বিষয়। একটা দেশ কষ্ট করে স্বাধীন করেছি আমরা, সে স্বাধীন দেশে গণমাধ্যমের ওপর এ রকম হামলা, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
পাহাড়ের রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপায়ন খীসার নেতৃত্বে আজ একটি দল নিয়ে প্রদর্শনী ঘুরে দেখে। দীপায়ন খীসা বলেন, ‘দুঃসহ স্মৃতির যে রাত, সে রাতটিকে আরেকবার দেখলাম। প্রথম আলো এটিকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, ওই রাতের ভয়াবহতা আমাদেরকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়। যারা এ হামলা করেছে তাদের একটা রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে, তারা ধর্মীয় উগ্রবাদ লালন করে। আর এরা বাংলাদেশকে একটা অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পথে যায়নি; গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকেই এগিয়েছে।’
আজ সহপাঠীদের নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে আসেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাজমিরা ইসলাম তোয়া। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘পোড়া জিনিসগুলো থেকে কীভাবে কারুকার্য তৈরি করা যায়, সেটি দেখিয়েছে প্রথম আলো। পোড়াগুলো দেখে যদিও খারাপ লেগেছে, তবে একটি দিক দেখে ভালো লেগেছে সেটি হলো, পোড়া জিনিসগুলোকে যে নতুন শিল্পকর্মের রূপ দিয়েছে, সেটা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।’
স্ত্রী নাজলী লায়লা মনসুরকে আলো প্রদর্শনী ঘুরে দেখলেন লেখক আবুল মনসুর। তিনি বলেন, ‘শিল্পের শক্তির একটা বহিঃপ্রকাশ এই প্রদর্শনী। ধ্বংসস্তূপ আবর্জনা ফেলে দেওয়ার জিনিস, সেটা যে রূপান্তরিত হয়ে শিল্পে পরিণত হতে পারে, এই উপলব্ধিটা আমরা ভালোভাবে জানলাম। ফেলে দেওয়া জিনিসও যে শিল্পে রূপান্তরিত হয়ে প্রতিবাদ করতে পারে, প্রতিরোধ করতে পারে। এই প্রদর্শনী আমাদের আবেগ আপ্লুত করেছে, আমরা আশা করি ভবিষ্যতে কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে।’
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের নিয়মিত পাঠক রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রাহিদ হাসান। তিনি স্ত্রী মাবিয়া ফেরদৌস ও সন্তান আইয়ান হাসানকে নিয়ে ‘আলো’ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন। তিনি জানান, যখন পত্রিকাতে পড়েন, তখন তার ৮ বছরের সন্তান পত্রিকার ছবিগুলো দেখে। সন্তান ও স্ত্রীর আগ্রহে তিনি তাদের নিয়ে এসেছেন আলো প্রদর্শনী দেখাতে। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে রাহিদ হাসান বলেন, ‘শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির ওপর এ রকম আঘাত মেনে নেওয়া যায় না। কোনোভাবেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়, আমরা চাই শান্তি ফিরুক। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে তাদের বিচার হোক, শাস্তি হোক। আমি যেন আমার সন্তানকে দেখাতে পারি যে দেখো, যারা আগুন দিয়েছে তাদের শাস্তি হয়েছে। অপরাধীদের শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক এ রকম ঘটনা ঘটবে।’