মা রাবেয়া বেগমের কোলে মেহমেদ বিন জিয়া
মা রাবেয়া বেগমের কোলে মেহমেদ বিন জিয়া

ছোট্ট মেহমেদের হামে মৃত্যু: আইসিইউতে তালা, লাইফ সাপোর্টে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে তখন অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতর ছড়িয়ে ছিল এক মায়ের উৎকণ্ঠা। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন রাবেয়া বেগম। কিছুক্ষণ আগেও তাঁর ৯ মাস ৫ দিন বয়সী ছেলে মেহমেদ বিন জিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাম ও হাম–পরবর্তী নানা জটিলতায় আইসিইউতে থেমে যায় শিশুটির শ্বাস।

কিন্তু কেন অনুমতি ছাড়াই শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলো এবং আইসিইউর গেটে তালা দেওয়া হয়েছিল কেন?—এই প্রশ্নের উত্তর চাইছেন মা রাবেয়া বেগম।

আমি ও ছেলের বাবা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম। আইসিইউ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক আমাকে বাইরে যেতে বলেন। তখনো তিনি আমার ছেলেকে যে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হবে তা জানাননি। ওই চিকিৎসক আমার ছেলেকে লাইফ সাপোর্টে রেখে বাইরে চলে যান। তখনই আমার মনে কেমন যেন লাগতে থাকে।
রাবেয়া বেগম, মেহমেদের মা

আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠার সেই রাত

১৫ মে রাতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে মেহমেদের পাশে ছিলেন মা রাবেয়া বেগম ও বাবা মো. জিয়াউল ইসলাম। আইসিইউর দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক তাঁদের বাইরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সন্তানকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হচ্ছে, এটা তাঁদের জানানো হয়নি বলে জানান রাবেয়া।

রাবেয়া বেগম একজন স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। শিশুটির বাবা মো. জিয়াউল ইসলাম আশুলিয়ায় একটি ব্যাংকে কর্মরত।

গতকাল মঙ্গলবার মুঠোফোনে রাবেয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এবং ছেলের বাবা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম। আইসিইউ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক আমাকে বাইরে যেতে বলেন। তখনো তিনি আমার ছেলেকে যে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হবে, তা জানাননি। ওই চিকিৎসক আমার ছেলেকে লাইফ সাপোর্টে রেখে বাইরে চলে যান। তখনই আমার মনে কেমন যেন লাগতে থাকে।’

মা ও বড় বোন আবিহার সঙ্গে মেহমেদ

শিশুটির মামা মো. সোহেল আকন প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক পরে শুধু বলেন—‘ঘুমের ইনজেকশন ও লাইফ সাপোর্ট’ দেওয়া হয়েছে। এরপর চিকিৎসক দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। এরপর পরিবারের সদস্যরা আইসিইউতে ঢুকে পড়েন। তিনি মুঠোফোনে তখনকার ভিডিও ধারণ করেন।

তাঁদের দাবি, সেখানে কোনো চিকিৎসককে দেখা যাচ্ছিল না, শুধু দুজন নার্স ছিলেন। নার্সেরা তাঁদের বাইরে বের হতে বলেন। এরপরই আইসিইউর গেটে তালা লাগানো হয়।

আইসিইউর গেটে তালা লাগানোর ভিডিওটি সোহেল আকন ফেসবুকে পোস্ট করলে তা আলোচনায় আসে। শিশুটির মা রাবেয়া বলেন, ‘পরে ডাকাডাকি করলে ওই চিকিৎসক মাস্ক পরে কোথা থেকে যেন আসেন। তিনি আসার পর গেটের তালা খোলা হয়। ততক্ষণে আমার ছেলে আর পৃথিবীতে নেই।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে স্বজনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া রোগীর স্বজন হাসপাতালে ‘মব’ সৃষ্টি করায় আইসিইউর গেটে তালা লাগানো হয়েছিল।

হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসক নেই, আইসিইউর গেটে তালা, শিশুটি মারা যাওয়ার পরের বেশ কিছু ভিডিও আছে শিশুটির পরিবারের কাছে। পরিবারটির সদস্যরা বলছেন, তখনকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, আইসিইউতে সে সময় উপস্থিত অন্য রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বললেই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যাবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। আর রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালে ‘মব’ সৃষ্টি করায় আইসিইউর গেটে তালা লাগানো হয়েছিল।

এক অসুস্থতার পর আরেক অসুস্থতা

মেহমেদ বিন জিয়ার অসুস্থতার শুরু এপ্রিলের শেষ দিকে। ঠান্ডা-কাশি নিয়ে ২৭ এপ্রিল তাকে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরীক্ষায় নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। জ্বর ও ডায়রিয়াও ছিল।

হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন মেহমেদ

এরপর একটু সুস্থ হয়ে ৭ মে বাসায় ফেরানো হয় মেহমেদকে। কিন্তু দুদিন পর আবার শুরু হয় জ্বর ও কাশি। অন্য হাসপাতালে সিট না পেয়ে ১৩ মে তাকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। প্রথমে হামের জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ডে, পরে ওই বিভাগের আইসিইউতে নেওয়া হয় তাকে। তখন তার হাম সংক্রমণও ধরা পড়ে।

মেহমেদ আগে থেকেই অসুস্থ থাকায় তাকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। তবে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছিল বলে জানান রাবেয়া বেগম।

রাবেয়া বেগম বলেন, ‘আমি চিকিৎসক না হলেও মেডিক্যালের কিছু বিষয় বুঝতে পারি। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগেও আমার ছেলে হেসেছে, খেলেছে। কখনো মনে হয়নি ওর লাইফ সাপোর্টের দরকার ছিল। তারপরও যদি নিতেই হয়, অনুমতি তো নিতে হবে।’

জরুরি পরিস্থিতি এবং স্টোর ছাড়া হাসপাতালের কোনো কক্ষেই তালা লাগানো যায় না। আর লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে রোগীর স্বজনের লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
মঈনুল আহসান, পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (হাসপাতাল ও ক্লিনিক)

শুধু বিচার নয়, প্রশ্নের জবাবও চান মা

সন্তানের মৃত্যুর জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসক–নার্সদের অবহেলাকে দুষছেন রাবেয়া বেগম। তাঁর আরও প্রশ্ন—কেন লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে অনুমতি নেওয়া হলো না? আর আইসিইউর গেটে কেন তালা লাগানো হলো?

হাসপাতালের সব চিকিৎসক ও নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই রাবেয়ার। তাঁর অভিযোগ শুধু ১৫ মে রাতের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, নার্স ও আয়াদের নিয়ে। তাঁর ধারণা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক হয়তো লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার মতো দক্ষ ছিলেন না অথবা তাঁর গাফিলতির কারণেই ছেলে মারা গেছে।

আইসিইউর গেটে তালা

রাবেয়া বলেন, ১৪ মে রাতেও ওই একই চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি ছেলের রিপোর্টের ছবি তুলে অন্য এক চিকিৎসককে দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি পাননি।

রাবেয়া বেগমের ভাষ্য, ‘একজন অধ্যাপক আইসিইউতে এসে ওই চিকিৎসক কেন ফাইলে শিশুর হিস্ট্রি লেখেননি, তা নিয়ে রাগারাগি করেন।’

রাবেয়া বলেন, ‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। তবে আমি চাই না, এভাবে আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক। দায়িত্বে অবহেলার জন্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাযথ বিচার চাই।’

শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে তার স্বজনেরা আইসিইউতে মব সৃষ্টির চেষ্টা চালান এবং নার্সদের গায়ে হাত তোলেন। সেখানে তো অন্য রোগীও আছে। সে জন্যই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না।
এ কে এম আজিজুল হক, পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
মেহমেদ বিন জিয়া

গতকাল মঙ্গলবার ওই হাসপাতালে গিয়ে পরিচালককে পাওয়া যায়নি, তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানানো হয়। পরে হাসপাতালটির পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে তার স্বজনেরা আইসিইউতে মব সৃষ্টির চেষ্টা চালান এবং নার্সদের গায়ে হাত তোলেন। সেখানে তো অন্য রোগীও আছে। সে জন্যই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না।’

লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে রোগীর স্বজনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাচ্চাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ডাক্তারই একমাত্র বলতে পারবেন রোগীর অবস্থা কেমন। মা–বাবা তো আর তা বলতে পারবেন না।’

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) পরিচালক চিকিৎসক মঈনুল আহসান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জরুরি পরিস্থিতি ও স্টোর ছাড়া হাসপাতালের কোনো কক্ষেই তালা লাগানো যায় না। আর লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে রোগীর স্বজনের লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

হাসপাতাল থেকে দেওয়া মেহমেদের মৃত্যুসনদ

ছোট্ট কবরের পাশে ফেলে আসা প্রশ্ন

পটুয়াখালীর বাউফলের নানাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে ছোট্ট মেহমেদকে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢাকায় ফিরবেন রাবেয়া বেগম ও জিয়াউল ইসলাম দম্পতি। ঢাকায় ফিরে তাঁরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গ্রামে এত স্বজনের মাঝে থেকেও তাঁরা যেন আটকে আছেন সেই আইসিইউর সামনে—বন্ধ দরজা, তালাবদ্ধ গেট আর নিথর হয়ে যাওয়া ছোট্ট শিশুটির শেষ মুহূর্তের কাছে। ছোট্ট মেহমেদের মা রাবেয়া বেগম হয়তো ঘুরেফিরে ভাবেন—সেদিন যদি তাঁকে আগে জানানো হতো, যদি একটু কথা বলা যেত, যদি দরজাটা বন্ধ না হতো...। তাহলে কি কিছু বদলাতে পারত?