পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন

বিশ্লেষকদের মত

রাজসাক্ষী ছাড়া দুর্বল হতো মামলা, তবে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তও দরকার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিদায়বেলায় রাজসাক্ষী উঠে এসেছে আলোচনায়। এ আলোচনার কারণ একজন প্রসিকিউটরের অভিযোগ। তিনি দাবি করেছেন, এই রাজসাক্ষী ঠিক করার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি।

বিষয়টি আলোচনায় ওঠার পর তা নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, যিনি দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের এই ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।

রাজসাক্ষী যে বিশ্বজুড়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত অংশ, তা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, অনেক জটিল বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় ভেতরের কারও সাক্ষ্য আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাক্ষ্য যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিচারে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল, তা তুলে ধরেছেন ডেভিড বার্গম্যান।

প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ দাবি করেছেন, সাবেক আইজিপি মামুনকে “ন্যায্য কারণ ছাড়াই” রাজসাক্ষী করা হয়েছিল।

তার এ কথাটি ঠিক নয় বলে মনে করেন ডেভিড বার্গম্যান। তিনি লিখেছেন, আবদুল্লাহ আল–মামুনের সাক্ষ্য না থাকলে সহ-অভিযুক্তদের (শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান) বিরুদ্ধে প্রমাণ অনেকটাই দুর্বল হয়ে যেত এবং মূলত একটি আড়ি পাতা ফোনালাপের ওপর নির্ভর করতে হতো। সে প্রেক্ষাপটে, সহ-অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলায় মামুনকে রাষ্ট্রীয় সাক্ষী হিসেবে পাওয়া প্রসিকিউশনের জন্য বড় ধরনের সাফল্য ছিল।

আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে রাজসাক্ষীর গুরুত্বটি তুলে ধরলেও রাজসাক্ষী ঠিক করার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তা তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করেন বার্গম্যান।

দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।
সুলতান মাহমুদ, প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

অন্য বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, এর তদন্ত দরকার। আর তা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, বাড়তে পারে গুজব।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে গত ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানকে। মামলাটির অন্য আসামি আল–মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় অপরাধ প্রমাণিত হলেও তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আরও দুটি মামলায় রায়ও হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, সাবেক আইজিপি মামুনকে ন্যায্য কারণ ছাড়াই রাজসাক্ষী করা হয়েছিল। রাজসাক্ষী করে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে এসআই আবজালুল হককে। এই দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামীম।

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলামকে, যিনি একসময় এই আদালতেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী ছিলেন।

দেড় বছর বাদে বিএনপি সরকার গঠনের পর গত সোমবার তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে। সেদিনই প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ রাজসাক্ষী ঠিক করার ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তারপরই শুরু হয় তা নিয়ে আলোচনা।

কী অভিযোগ প্রসিকিউটরের

‘কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে গত সোমবার একটি পোস্ট দেওয়া হয় এই শিরোনামে—‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ সেই পোস্টে দুটি মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। তিনি সেখানে সহকর্মী তাজুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দলের প্রধান ছিলেন তাজুল ইসলাম। প্রসিকিউশনের প্রশাসনিক বিষয়টি দেখভাল করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন।

তাজুলের প্রসিকিউশন দলেরই একজন সদস্য সুলতান মাহমুদ লিখেছেন, ‘দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।’

প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ

গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি (রাজসাক্ষী) পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হকের স্ত্রীকে সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইনের কক্ষে ঢুকতে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন সুলতান মাহমুদ।

তিনি লিখেছেন, ‘তা দেখার পর তাজুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাঁকে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাজুল ইসলাম এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাঁকে বকাঝকা করেছিলেন। তামীম তখন সবার সামনে এসআই আবজালের স্ত্রীর তাঁর কক্ষে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু টাকার বিনিময়ে আবজালকে রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’

সাবেক আইজিপি আল–মামুনকে কেন রাজসাক্ষী করা হলো, সেই অভিযোগও তুলেছেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। তিনি দাবি করেন, আল–মামুনকে নিয়ে ‘রাজসাক্ষীর নাটক’ বানান তাজুল ইসলাম।

চানখাঁরপুলের মামলায়ও পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুল ইসলামকে আসামি না করে সাক্ষী করার পেছনে দুর্নীতি রয়েছে বলে দাবি করেন সুলতান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, ‘এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে, এ রকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়ও আসামির তালিকায় রংপুর মহানগর পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার আল ইমরান হোসেনকে না রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুলতান মাহমুদ।

তিনি লিখেছেন, ‘রংপুরের আবু সায়ীদের মামলায় এসি ইমরানকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষী আদালতে এসে বলেছে।’

‘কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ’ ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া পোস্ট

মামুন ও আবজালুল যেভাবে রাজসাক্ষী

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর বিচারপ্রক্রিয়ায় এই পর্যন্ত দুজন আসামিকে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী করা হয়েছে। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আল-মামুন ছাড়া অন্যজন হলেন সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক। অ্যাপ্রুভার হতে হলে আসামিকে নিজের দোষ স্বীকার করতে হয়। এই দুজন নিজের দোষ স্বীকার করে নেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৫ ধারায় অ্যাপ্রুভারের বিষয়টি রয়েছে। এই ধারার শিরোনাম ‘পারডন অব অ্যান অ্যাপ্রুভার’, যার বাংলা দাঁড়ায় ‘দোষ স্বীকারকারী সাক্ষীর ক্ষমা’। এই ধারার উপধারা-১–এ কী করলে একজন দোষ স্বীকারকারী সাক্ষী (যিনি আগে আসামি ছিলেন) ক্ষমা পেতে পারেন, সে সম্পর্কে বলা আছে।

তাতে উল্লেখ রয়েছে, বিচারের যেকোনো পর্যায়ে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনাল এই শর্তে ক্ষমা করতে পারেন যে সেই ব্যক্তি ঘটনার মূল হোতা বা সহায়তাকারীসহ পুরো ঘটনা সম্পর্কে যা জানেন, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করবেন। অর্থাৎ অপরাধের কোনো ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণ ও সত্য তথ্য প্রদান করার শর্তে দোষ স্বীকারকারী সাক্ষীকে ক্ষমা করতে পারেন ট্রাইব্যুনাল।

সাবেক আইজিপি আল-মামুন যে মামলায় আসামি ছিলেন, তার অন্য দুই আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দুজনই পলাতক। গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি আল–মামুন গত ২ সেপ্টেম্বর রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেছিলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সরাসরি মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মাধ্যমে গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার ওই নির্দেশনা পেয়েছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের নির্দেশেই গণহত্যা সংঘটিত হয়।

এই জবানবন্দির পর প্রসিকিউশন তখন বলেছিল, সাবেক এই আইজিপি পূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন। পরে ১৭ নভেম্বর দেওয়া রায়ে অন্য দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও লঘুদণ্ড (পাঁচ বছর কারাদণ্ড) সাজা হয় তাঁর।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এই পর্যন্ত দুজন অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হয়েছেন। একজন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অন্যজন শেখ আবজালুল হক। নিজের দোষ স্বীকার করে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাঁরা। রায়ে আল মামুনের পাঁচ বছর সাজা হয়েছে, খালাস পেয়েছেন আবজালুল হক।

অন্যদিকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গত ১৯ নভেম্বর রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আসামি সাবেক এসআই আবজালুল হক। তিনি বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আশুলিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিল থানার দিকে এগোলে তৎকালীন ওসির নির্দেশে গুলি চালানো হয়। লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন।

পরে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আবজালুল আশুলিয়ার ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন বলে তাঁরা মনে করেন।

শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে তাঁদের দুজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে, তবে রাজসাক্ষী আল–মামুনের সাজা হয়েছে পাঁচ বছর কারাদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার রায় হয় গত ৫ ফেব্রুয়ারি। রায়ে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

যেকোনো রাজসাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা সব সময় প্রশ্নের মুখে থাকে—এমন মন্তব্য করে ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, আইনজীবীরা প্রায়ই বলেন, এসব সাক্ষী নিজের বাঁচার জন্য সাক্ষ্য দেন, তাই তাঁদের পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।

‘এটি ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। শেষ পর্যন্ত, অ্যাপ্রুভারের সাক্ষ্যের গুরুত্ব নির্ভর করে তার বক্তব্য কতটা সংগতিপূর্ণ, অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে কতটা মেলে এবং তার কিছু অংশ আলাদাভাবে প্রমাণ করা যায় কি না—এসব বিচারকদেরই বিবেচনা করতে হয়,’ লিখেছেন বার্গম্যান।

তাজুলের অস্বীকার, পাল্টা অভিযোগ

রাজসাক্ষী নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ‘প্রকাশিত সংবাদের ব্যাপারে আমার স্পষ্ট বক্তব্য’ দেন তিনি।

সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কিছুসংখ্যক গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আমার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনৈক প্রসিকিউটরের বরাতে কিছু বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে উক্ত বক্তব্যসমূহ জঘন্য মিথ্যাচার, তথ্য প্রমাণবিহীন এবং আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুরভিসন্ধি থেকে করা হয়েছে। উক্ত বিদ্বেষপ্রসূত ও অভিযোগগুলো সর্বতোভাবে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।’

সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

এ অভিযোগ প্রমাণের চ্যালেঞ্জ দিয়ে তাজুল ইসলাম লেখেন, ‘আমি মনে করি, পতিত স্বৈরাচার এবং গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিকৃত এবং চলমান বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহল সংঘবদ্ধভাবে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে এই বিচার আর কোনোভাবে অগ্রসর না হতে পারে।’

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমও প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

উক্তি ২ পতিত স্বৈরাচার এবং গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিকৃত এবং চলমান বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহল সংঘবদ্ধভাবে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে এই বিচার আর কোনোভাবে অগ্রসর না হতে পারে।
তাজুল ইসলাম, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর

এ ঘটনার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে প্রসিকিউটর পদ থেকে সুলতান মাহমুদকে সরিয়ে দিতে দেড় মাস আগে আইন উপদেষ্টাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাজুল ইসলাম। তিনি সহকর্মী সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহের অভিযোগ করেন। পাশাপাশি স্ত্রী ও গানম্যানকে নির্যাতনের অভিযোগও আনা হয় সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে।

তবে সুলতান মাহমুদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে \\Iপ্রথম আলো\\Iকে বলেন, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করায় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এখন তোলা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

অভিযোগ গুরুতর, তদন্ত দরকার

রাজসাক্ষী করা নিয়ে যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, তাই বিষয়টি তদন্ত করা দরকার বলে মনে করেন ডেভিড বার্গম্যান। তিনি লিখেছেন, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ এমন অভিযোগ তুলেছেন যে অভিযুক্তদের অ্যাপ্রুভার বানানোর বিনিময়ে প্রসিকিউটররা টাকা নিয়েছেন। অভিযোগটি স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন তোলে। সাধারণত প্রসিকিউটররা অভিযুক্তদের রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন যদি কোনো অনৈতিক লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে যুক্তি অনুযায়ী সুবিধা যাওয়ার কথা সাক্ষীদের দিকে, প্রসিকিউটরদের দিকে নয়।

‘এখন একটি অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে অবশ্যই তা ঠিকভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। তবে এ মুহূর্তে, আমার মতে, এই নির্দিষ্ট অভিযোগটি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।’

এখন একটি অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে অবশ্যই তা ঠিকভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। তবে এ মুহূর্তে, আমার মতে, এই নির্দিষ্ট অভিযোগটি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

অভিযোগের সত্যাসত্য উদ্ঘাটনে তদন্তের পক্ষে মত দেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলো অন্তত গুরুতর অভিযোগ। যদিও এর মধ্যে প্রশ্ন থাকতে পারে। যেমন ভারী ব্যাগের কথা বলা হয়েছে। ভারী ব্যাগ হলেই টাকা থাকবে, সেটার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এগুলো তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে এখনই তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এটিকে ঝুলিয়ে রাখার মতো বিষয় নয়। কারণ, এর ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ যে আদালতে হচ্ছে, সেখানে যদি দুর্নীতি থাকে, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

যদি অসদুদ্দেশে অভিযোগ আনার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযোগকারীকেও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে আসা দুর্নীতির অভিযোগ গুরুতর হিসেবে দেখে তদন্তে জোর দিচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়াও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুলতান মাহমুদ যেহেতু নিজেই প্রসিকিউশন টিমের অংশ, তিনি তো আসলে ভেতরের বিষয় জেনেশুনেই বলছেন। এ রকমের একটা প্রাইমারি আইডিয়া আমার–আপনার উনার বক্তব্য পড়েই মনে হবে। …তিনি তো একটা ভাইটাল উইটনেস এই ঘটনায়, যদি করাপশন হয়ে থাকে।’

বিষয়টি আনরিজলভ রেখে দিলে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তা না হলে গুজবের ডালপালা বাড়তে পারে।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

আবার সুলতান মাহমুদ যদি মিথ্যা অভিযোগ তোলেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তবে বিষয়টি ফেলে না রেখে সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আনরিজলভ রেখে দিলে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তা না হলে গুজবের ডালপালা বাড়তে পারে। গুজবের ডালপালা যাতে না গজায়, সে জন্য যথাযথ তদন্ত করে এর নিষ্পত্তি করা উচিত।’

ট্রাইব্যুনালের নতুন প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এই উদ্যোগ নিতে পারেন বলে মনে করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলো যেহেতু বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এসব মামলার নথিপত্র এখনো প্রসিকিউশনের কাছে আছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর (মো. আমিনুল ইসলাম) এসেছেন। তিনি চাইলেই বিষয়টি সুরাহা করতে পারেন।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম

যা বললেন নতুন চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. আমিনুল ইসলাম মঙ্গলবার তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আলোচিত এ বিষয়ের কোনো ব্যাখ্যা প্রধান প্রসিকিউটর দেবেন কি না।

জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। আমি এই ট্রাইব্যুনালের সমস্ত কার্যক্রম আমাকে বুঝতে হবে। সমস্ত মামলার বিষয়বস্তু আমাকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। আপনারা যেসব অভিযোগ নিয়ে আসছেন, সেটাও আমাকে তদন্ত করে দেখতে হবে।’

‘আমি আপনাদেরকে সুস্পষ্টভাবে একটা কথা বলতে চাই। আমার দায়িত্ব পালনকালে এই ট্রাইব্যুনালে আমিসহ আমার কোনো প্রসিকিউটর বা ট্রাইব্যুনালে জড়িত অন্য কেউ কোনো ধরনের করাপশনে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বলেন তিনি।