
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই সচিবালয়ে গিয়ে ‘মব কালচার’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণের সংস্কৃতি) পুরোপুরি বন্ধ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এটা চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ওই দিন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রথম কর্মদিবসে তিনি বলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না। তবে যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপিও দেওয়া যাবে। আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।’
মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ‘মব কালচার’ শেষ তো হয়ইনি বরং দেখা গেছে গত মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে তা বেড়েছে। এই বেড়ে যাওয়ার প্রবণতার হিসাব দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। আজ বৃহস্পতিবার দেওয়া এপ্রিল মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এমএসএফ প্রতি মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদন দেয়। বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
চলতি এপ্রিল মাসে মবে বা গণপিটুনিতে ২১ জন নিহত হয়েছেন বলে এমএসএফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত মার্চ মাসে মবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১৯। এ মাসে মবের ঘটনা ঘটেছে ৪৯টি। আর মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৩৬। মবে আহত ব্যক্তির সংখ্যাও এ মাসে বেশি, ৪৯। আগের মাসে ছিল ৩১ জন।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আজ প্রথম আলোকে বলেন, সমাজে নানা অপরাধের সঙ্গে এর বিশেষ পার্থক্য আছে। মব হলো রাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। রাষ্ট্র এবং মব একসঙ্গে চলতে পারে না। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মবকে ফুলস্টপ বলেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে মব তো থামেইনি বরং বেড়েছে। এটা সরকারের সদিচ্ছার অভাব না অযোগ্যতা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
সাইদুর রহমান বলেন, মব হলো বিচারবহির্ভূত প্রবণতা। এ প্রবণতা এখন বাড়ছে।
অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সংখ্যাও বাড়ছে
চলতি মাসে অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সংখ্যাও বেড়েছে।
এ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১টি শিশু, ২ জন কিশোর, ১২ জন নারী ও ৪১ জন পুরুষ, মোট ৫৬টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এমএসএফ বলছে, এ ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতাই বড় কারণ। অল্পসংখ্যক ঘটনা ছাড়া সব কটি লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। দাফনের জন্য দেওয়া হচ্ছে আঞ্জুমান মুফিদুলকে।
এমএসএফের তথ্য বলছে, গত মার্চ মাসে এর সংখ্যা ছিল ৫৩। এসব অজ্ঞাতপরিচয় লাশের বেশির ভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের পাশে, ফসলি জমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যাচ্ছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ৩১২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ সংখ্যা গত মাসের তুলনায় ২৩টি বেশি। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৫৪টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১৪টি, ধর্ষণ ও হত্যা একটি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ছয়জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী।
ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের মধ্যে ১৮টি শিশু ও ১৪ জন কিশোরী রয়েছে, অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১টি শিশু, ৪ জন কিশোরী ও ৯ জন নারী এবং ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে একজন কিশোর ও একজন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা ২৩টি, যৌন হয়রানি ১৭টি, শারীরিক নির্যাতনের ৬৮টি ঘটনা ঘটেছে। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছেন একজন নারী।
এ মাসে পাঁচজন কিশোরী ও ২১ জন নারীসহ মোট ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ মাসে অপহরণের শিকার হয়েছেন ২টি শিশু ও ২ জন কিশোরী, অন্যদিকে ১ জন কিশোরী ও ৯ জন নারী নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া এপ্রিল মাসে ২ জন কিশোরী ও ৫ জন নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ মোট ৮৯ শিশু, কিশোরী ও নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এটি গত মাসের তুলনায় ১৬টি বেশি। তাঁদের মধ্যে ১১টি শিশু ও ১২ জন কিশোরী রয়েছেন।
এমএসএফ বলেছে, এ মাসে শিশু ধর্ষণের চেষ্টার একটি ঘটনা ও নারী ধর্ষণের চেষ্টার একটি ঘটনা সমাজপতিরা আপস করেছেন। প্রচলিত আইনকে অবজ্ঞা করে বেআইনিভাবে সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার সিদ্ধান্ত হয়েছে।