‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর শেষ দিন ‘বিশ্বের জন্য বঙ্গোপসাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা। ঢাকা, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর শেষ দিন ‘বিশ্বের জন্য বঙ্গোপসাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা। ঢাকা, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন

বাইরের শক্তি চাইলে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সমস্যা তৈরি করতে পারে, সামষ্টিক স্বার্থে এ অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাইরের শক্তি চাইলে সমস্যা তৈরি করতে পারে, এই আশঙ্কা সব সময়ই আছে। কিন্তু এটা নির্ভর করে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর সতর্কতার ওপর। কারণ, এ অঞ্চলে কোনো সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে সেটি বাংলাদেশসহ কারও জন্য হিতকর হবে না। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখা এ অঞ্চলের দেশগুলোর সামষ্টিক স্বার্থ।

‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর শেষ দিন আজ সোমবার ‘বিশ্বের জন্য বঙ্গোপসাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’ আয়োজন করে। আজ বিকেলে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সমাপনী বক্তব্যের ঠিক আগের পর্বে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও সানোবার ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এশিয়ার অন্যান্য সমুদ্রাঞ্চলের মতো বঙ্গোপসাগরকেও ক্রমবিকাশমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ওপর নজর রাখা উচিত। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটাকে চীনের পক্ষের অনেকে ‘চীন ঠেকাও নীতি’ বলে থাকেন।

আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু আমরা দেখেছি, চীনারা তাদের কিছু সামুদ্রিক বাণিজ্য এশিয়া ও ইউরোপের দিকে নিয়ে গেছে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ইউরেশিয়ান অংশীদারত্বের ধারণা থেকে সুবিধা নিচ্ছে। অর্থাৎ অনেক চীনা ব্যবসা সামুদ্রিক রুট পরিবর্তন করছে।’

বাব আল–মানদেব ও হরমুজ প্রণালি ইতিমধ্যে চাপে রয়েছে উল্লেখ করে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, এখন মালাক্কা প্রণালি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভুক্তভোগী হলে কী হবে, সেটি উদ্বেগের বিষয়। বিষয়টি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তাদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত, যাতে এমন কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যা পশ্চিম এশিয়াকে প্রভাবিত করে।

বঙ্গোপসাগর বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরে আইজাজ আহমেদ বলেন, ‘পাকিস্তান বঙ্গোপসাগরীয় সম্প্রদায়ের গুরুত্ব স্বীকার করে। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি, ব্যবসার রুট হওয়া উচিত মুক্ত ও অবাধ। আমাদের পণ্যও ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ রাখা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখা এটা আমাদের সামষ্টিক স্বার্থ।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের এশিয়া স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক প্রদীপ তানেজা বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাইরের শক্তি চাইলে সমস্যা তৈরি করতে পারে, এ আশঙ্কা সব সময়ই আছে। কিন্তু এটা নির্ভর করে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর সতর্কতার ওপর। কারণ, এ অঞ্চলে কোনো সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে সেটি বাংলাদেশসহ কারও জন্য হিতকর হবে না। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও নেতারা নিজ দেশের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন বলে আমি মনে করি।’

জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙায় সম্ভাবনা

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থানগত যে সুবিধা রয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে ডেনমার্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে কী ধরনের অংশীদারত্ব সম্ভব, সে বিষয়ে কথা বলেন ঢাকায় নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে পারে। ওষুধ খাত তো রয়েছেই, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ রিসাইক্লিং (ভাঙা) একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা হতে পারে।

ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ডেনমার্কের ব্যতিক্রমভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে ডেনমার্ক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতেও ডেনমার্কের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। ফলে কিছু উন্নয়ন-সহায়তা কমাতে হয়েছে।’

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসারিয়াল লেকচারার জন কে গ্লেন বলেন, ‘পৃথিবীর পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, এর সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু এরপর কী আসছে, সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। শুধু নতুন ব্যবস্থাকে সমর্থন করাই যথেষ্ট নয়।’

এ পর্বের আলোচনায় অন্যদের মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনিন রাশিদ বক্তব্য দেন।