
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ পর্যালোচনা ছাড়াই জাতীয় সংসদে অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেন, অধ্যাদেশটির ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতাগুলোকে ঠিক করার জন্য আগামী দিনে তাঁরা কাজ করবেন। তবে এই মুহূর্তে অধ্যাদেশে যেটুকু আছে, সেটুকুকে সুরক্ষা দেওয়াটাই মূল কর্তব্য।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। মতবিনিময় সভার আয়োজক জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়।
সভায় এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভেতরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটি যেমন আছে, তেমনভাবে যেন অবশ্যই অনুমোদিত হয়। এটার ব্যাপারে সন্দেহের কোনো জায়গা থাকতে পারে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অধ্যাদেশটি পাস হওয়ার পর মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে হলে আরও কয়েকটি সম্পূরক সুরক্ষার জায়গায় যেতে হবে। এ জন্য প্রথমে দরকার বর্তমান যে কমিশন আছে, তার ধারাবাহিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। তিনি বলেন, এই কমিশন বিগত সরকারের শেষ সময়ে তৈরি। সেহেতু নতুন রাজনৈতিক সরকারকে এটা গ্রহণ করতে হবে। এটা গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান এখানে আছে। তাই এটাকে নিয়ে আবার নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার দরকার নেই।
নাগরিক অধিকারকে ঠিকমতো সুরক্ষা দিতে হলে দেশে একটা বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রয়োজন রয়েছে বলে সভায় মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য সংবিধানে থাকা ন্যায়পাল নিযুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো আইন হলো মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ। তবে কিছু অপ্রাপ্তি রয়েছে। যেমন আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়টি পুরোপুরি হয়নি। তারপরও অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা ছাড়াই সংসদে পাস করাতে নতুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, পর্যালোচনার কাজ শুরু হলে বিভিন্ন প্রতিকূলতা আসতে পারে। যেটুকু পাওয়া গেছে, সেটুকুও হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সভায় মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা কমিশনের উদ্দেশে নিজেদের পরামর্শ তুলে ধরেন। ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু কমিশন গঠন করার জন্য কমিশন না হয়ে এটি যেন ভালো ভূমিকা পালন করে। যে আইন পাস করা হবে, সেটা যেন ‘কাগুজে বাঘ’ না হয়। বিষয়টি যেন সত্যিকারের মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য করা হয়।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, যাঁরা সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে থাকেন, তাঁরাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তাই জেলা পর্যায়ের মানবাধিকার কমিটি গঠন এবং সেগুলোকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। মানবাধিকারবিষয়ক আলোচনায় তিন পার্বত্য জেলার কথা বলা হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈষম্যের অবসান করতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলার মানবাধিকার বাস্তবায়নে যেন মানবাধিকারকর্মীরা কাজ করতে পারেন।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনারদের অতীত কাজ, ব্যক্তিগত অবস্থান এবং জনজীবনে তাঁদের ভূমিকা অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে আইন যত দূর অনুমতি দেবে, কমিশন তত দূর পর্যন্ত আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে কমিশন নিষ্ক্রিয় থাকতে চায় না। তবে কমিশনের সদিচ্ছা যতই থাকুক না কেন, তার কার্যকারিতা অনেকখানি নির্ভর করে আইনগত ভিত্তির ওপর। তাই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি যদি বর্তমান কার্যকর রূপে বহাল থাকে, তাহলে এটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও স্বাধীনতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনসের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্ট্যাটাস বি–এর অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ায় আমরাই এখনো স্ট্যাটাস এ–তে উত্তীর্ণ হতে পারিনি।’
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, আদিবাসী অধিকারকর্মী দিপায়ন খীসা, ‘স্বদেশ’–এর নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত প্রমুখ। এতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।