হাসনাত আবদুল হাই
হাসনাত আবদুল হাই

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো–১৭

লিখে চলেছেন হাসনাত আবদুল হাই

ডাকঘর নাটকের অমল যেমন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে জগৎটাকে দেখত, তাঁর শৈশবে তিনিও দুনিয়া দেখেছেন জানালা দিয়ে। বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক ও সাবেক সচিব হাসনাত আবদুল হাইয়ের জীবনকথা শুনতে আমরা গিয়েছিলাম তাঁর ধানমন্ডির বাসায়। ১ মার্চ ২০২৬-এর ফাল্গুনের সকালে; ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শিরোনামের সাক্ষাৎকার সিরিজের অংশ হিসেবে।

তিনি খুলে দিলেন স্মৃতির জানালা। ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এক ইতিহাস তাঁর অভিজ্ঞতায় জমা হয়ে আছে। তাঁর জীবনের শুরুটাই যেন এক ছোট্ট জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখা।

১৯৩৭ সালের মে মাসে কলকাতায় তাঁর জন্ম। সরকারি কাগজে অবশ্য জন্মসাল লেখা আছে ১৯৩৯।

তাঁর শৈশবের প্রথম স্মৃতি পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটে। বাবা তখন থানার দারোগা। থানার পাশের একটি একতলা বাড়িতে তাঁদের বাসা। ছোট্ট হাসনাতের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। তাই দিনভর তিনি জানালার শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। সেই জানালাই ছিল তাঁর প্রথম পৃথিবী দেখার জায়গা।

সকালে তিনি দেখতেন, বাড়ির সামনে একটি ইঁদারায় পুরুষেরা এসে গোসল করছে। দুপুরের দিকে মেয়েরা আসে কাপড় কাচতে। একদিন তিনি তাঁর বড় বোনকে জিজ্ঞেস করলেন, মেয়েরা সকালে আসে না কেন? বোন বলেছিলেন, ‘পুরুষেরা আগে আসবে, তারপর মেয়েরা।’ শিশুমনে তখনই প্রথম ধরা পড়ে সমাজে নারী-পুরুষের অবস্থানের পার্থক্য।

সেই জানালা দিয়েই তিনি আরও অনেক কিছু দেখেছিলেন—যক্ষ্মা রোগী, দুর্ভিক্ষে কাতর মানুষ, আবার স্বদেশি আন্দোলনের মিছিলও। একদিন হঠাৎ দেখলেন, কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষজন আশপাশে ভিড় করছে। কারণ, তখন জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলবে—এই আতঙ্ক। ছোট্ট ছেলেটি তখন বুঝতে শুরু করল, মানুষ শুধু রোগে বা দুর্ভিক্ষে নয়, যুদ্ধের বোমাতেও মারা যায়।

পুলিশ কর্মকর্তা বাবার বদলি চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে নানা শহরে। বাবা ভর্তি করিয়েছিলেন মক্তবে। পাশেই ছিল হাইস্কুল। বাবার মনে হয়েছিল, মুসলিম সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরিচয় ধরে রাখা দরকার।

পরে যশোরে গিয়ে তাঁর জীবনে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটে। তাঁদের বাসার আশপাশে বেশির ভাগ পরিবার ছিল হিন্দু। পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট লাইব্রেরি ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলত, কে কত বই পড়ল। সেই প্রতিযোগিতাই তাঁকে বইয়ের জগতে টেনে নেয়।

প্রথমে পড়েন ‘মোহন সিরিজ’-এর গোয়েন্দা গল্প। তারপর ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মনোজ বসু, সুশীল জানাদের বই।

ফরিদপুর জিলা স্কুলে তাঁর ছাত্রজীবন ছিল অসাধারণ। স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় প্রধান শিক্ষক তাঁকে নিতে চাইছিলেন না, কারণ তিনি বছরের মাঝামাঝি এসে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। তখন হাসনাত আবদুল হাই বলেছিলেন, ‘আমি আগের স্কুলে ফার্স্ট বয় ছিলাম। এখানেও ফার্স্ট হব।’

প্রধান শিক্ষক একটি বাক্য বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে দিলেন—ছেলেরা রৌদ্রে দৌড়াদৌড়ি করিতেছে। হাসনাতের উত্তর ছিল, Boys are running about in the sun. উত্তরের নির্ভুলতায় মুগ্ধ হয়ে প্রধান শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে নিয়ে নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে যান এবং পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছায় তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সমগ্র পাকিস্তানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।

১৯৬৫ সালে তিনি প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। তাঁর প্রথম পোস্টিং ছিল ময়মনসিংহে সহকারী কমিশনার হিসেবে। পরে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন, একই সঙ্গে লিখেছেন অসংখ্য গল্প-উপন্যাস। তাঁর মতে, সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষকতা করলে হয়তো বৌদ্ধিক অর্জন বেশি হতো, কিন্তু প্রশাসনের কাজ তাঁকে দিয়েছে বহুমাত্রিক জীবনের অভিজ্ঞতা।

তিনি গ্রাম দেখেছেন, শহর দেখেছেন, ক্ষমতার ভেতরের বাস্তবতা দেখেছেন, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম দেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখাকে গভীরতা দিয়েছে।

আজকের তরুণদের জন্যও তাঁর পরামর্শ প্রায় একই রকম। তিনি মনে করেন, লেখক হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো ব্যাপক পাঠ। শুধু নিজের ভাষার সাহিত্য নয়, অন্য ভাষার সাহিত্যও পড়তে হবে। কারণ, সাহিত্যের জগৎ আসলে একটি বড় মানবিক অভিজ্ঞতার ভান্ডার।

রানাঘাটের সেই ছোট্ট জানালায় দাঁড়িয়ে যে শিশু পৃথিবী দেখত, তার চোখেই হয়তো ধরা পড়েছিল মানুষের জীবন, সমাজ, বৈষম্য, ইতিহাসের চলমান নাটক। সেই জানালা থেকেই শুরু হয়েছিল একজন লেখকের দৃষ্টি।

৯০ বছরের দিকে যাচ্ছেন হাসনাত আবদুল হাই। বললেন, ‘এমনও হতে পারে, এটাই আমার শেষ সাক্ষাৎকার।’ কিন্তু এই বয়সেও তিনি কাজে মগ্ন, এবার অনেকগুলো ঈদসংখ্যায় বের হবে তাঁর উপন্যাস। চার পুরুষ নামে একটা বড় কাজ ধরেছেন। তাঁর মনে শঙ্কা জাগে, মনের মতো করে শেষ করতে পারবেন উপন্যাসটি?

হাসনাত আবদুল হাই, আপনি আরও অনেক বছর বাঁচুন, এই প্রার্থনা।