
‘আমি আমার মাকে (মাতৃভাষা) খুঁজে পেতে চাই, আপনারা আমার মাকে খুঁজে দেন।’ কথাগুলো বলছিলেন পঙ্কজ কন্দ। তাঁর সঙ্গে কথা হয় গতকাল সোমবার। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঠিক আগের দিন। তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল তাঁদের মাতৃভাষা নিয়ে। পঙ্কজ কন্দ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা বাস করেন মূলত সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা–বাগানে। পঙ্কজ থাকেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে।
উড়িয়া এবং কুইভ—এই দুই ভাষায় কথা বলেন কন্দরা। তবে বেশির ভাগই উড়িয়া ভাষায় কথা বলেন। উড়িয়া ভাষা ব্যবহারকারী কন্দদের মধ্যে এই ভাষায় কোনো বর্ণমালা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কন্দদের দৈনন্দিন জীবনে নিজেদের মধ্যে উড়িয়া এবং কুইভ ভাষার চর্চা খুবই কম। এই ভাষা এখন প্রায় চরম হুমকির মুখে। ভাষা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিক (সিল)। তারা দেশের বিপন্ন ২০টি ভাষার মধ্যে কন্দসহ চার ভাষার জরিপ গবেষণা সম্পন্ন করেছে। কন্দ ছাড়া অন্য তিন ভাষা হলো হুদি, পাত্র ও বানাই।
সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর কর্নেলিউশ টুডু বলছিলেন, ‘দেশের মানুষের কম জানা ভাষাগুলোর অবস্থা জানতেই এই গবেষণা করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য ভাষাগুলোর সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও পুনরুজ্জীবিত করা। যে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, তার সংরক্ষণ কীভাবে করা যায়, তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা দেখেছি, চারটি ভাষাই বিপন্ন অবস্থায় মধ্যে আছে।’
সারা বিশ্বে ভাষার অবস্থা বিবেচনার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নিরিখ হলো ‘ফিশম্যান মানদণ্ড’। সেই মানদণ্ডের বিচারে বাংলাদেশের সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
ফিশম্যান মানদণ্ডের পুরো নাম গ্রেডেড ইন্টারজেনারেশনাল ডিসরাপশেন স্কেল (জিআইডিএস)। একটি ভাষার অবস্থা কী, সেটি বোঝাতে এই মানদণ্ডের আটটি স্তর রয়েছে। চতুর্থ স্তরে থাকলেও ভাষাটি বিপন্ন হিসেবে গণ্য হয় না। কিন্তু চারের পরের স্তরে, অর্থাৎ পঞ্চম স্তরে চলে গেলে ওই ভাষা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হবে। ওই মানদণ্ডের প্রথম স্তরের বিবেচনার বিষয় হলো, ভাষাটি ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় কি হয় না। বাংলাদেশের কোনো আদিবাসী ভাষাই সরকারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় না।
ফিশম্যান মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে চারটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার বর্তমান অবস্থা, দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষাক্ষেত্রে তারা কোন ভাষা বেশি ব্যবহার করছে, নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষায় অভ্যস্ত কি না—এসব বিষয় নির্দিষ্ট করে সিলের গবেষণা চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই চারটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাই বিপন্নের পথে।
গবেষণার অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে এই চার ভাষা বেছে নেওয়া কেন—প্রশ্নের উত্তরে সিলের প্রধান গবেষণা সমন্বয়কারী মাইফুল আরা প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই চারটি জাতিগোষ্ঠীর অবস্থা অনেক প্রান্তিকে। এসব ভাষা সম্পর্কেও মানুষের জানা অনেক কম। সে জন্যই এই চার ভাষা বেছে নেওয়া হয়েছে।
সিল যে চার ভাষায় গবেষণা করেছে, এর মধ্যে হুদিদের ভাষা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফিশম্যান মানদণ্ড অনুযায়ী এটি অষ্টম স্তরও অতিক্রম করেছে। বানাইদের ভাষা বিলুপ্তির পথে, এটি আছে অষ্টম স্তরে। কন্দদের ভাষা হুমকির মুখে আছে ছয়ের ওপরে। আর পাত্রদের ভাষা ষষ্ঠ স্তরে বিপন্ন অবস্থায় আছে।
শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় ১৫টি উপজেলার ১২৬টি গ্রামে প্রায় ২ হাজার ১৪৩টি হুদি পরিবারের বাস। সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে হুদিদের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা মিশে গেছে। সময়ের আবর্তে হুদিদের মাতৃভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সিলের মাইফুল আরা বলছিলেন, ‘আমরা হুদি সম্প্রদায়ের যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, বেশির ভাগই তাঁদের মাতৃভাষা সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বলেছেন যে তাঁদের মাতৃভাষা ছিল, কিন্তু আমরা যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের মধ্যে এমন কাউকে পাইনি যে তাঁদের ভাষায় কথা বলতে পারে বা তাঁদের মাতৃভাষার নাম বলতে পারেন। কিন্তু আমরা এমন কয়েকজনকে পেয়েছি, যাঁরা তাঁদের ভাষা সম্পর্কে অনেক কিছু না বলতে পারলেও কিছু কিছু শব্দ তাঁরা বলতে পারেন।’
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি হলো কন্দ একটি । ‘স্লেভ ইন দিস টাইম, টি কমিউনিটি অব বাংলাদেশ’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১২টি উপজেলায়, ৩০টি চা–বাগানে প্রায় ৫৩৯টি কন্দ পরিবার বাস করে। ভারতে কন্দদের তিনটি ভাষার প্রচলন রয়েছে, সেগুলো হলো উড়িয়া, কুইভ ও তেলেগু।
সিলের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের কন্দ ভাষাভাষীদের মধ্যে উড়িয়া ভাষাকে মাতৃভাষা বলেছিলেন ৭৬ শতাংশ মানুষ। তবে ৪২ শতাংশ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার রয়েছে। কুইভ ভাষাকে মাতৃভাষা বলেছেন ১১ শতাংশ মানুষ। কিন্তু মাত্র ১ শতাংশের এর চেয়ে কমসংখ্যক কন্দরা এই ভাষায় কথা বলতে পারে। উড়িয়া ভাষার কোনো বর্ণমালা পাওয়া যায়নি। মূলত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং মধ্যবয়স্কদের মধ্যে এই ভাষার ব্যবহার দেখা যায়।
সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, জাফলংয়ের চা–বাগানে উড়িয়া ভাষার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা–বাগানে কন্দ সম্প্রদায়ের লোকজন কুইভ ভাষা ব্যবহার করেন। কন্দরা নিজেদের মধ্যে উড়িয়া (মাতৃভাষা) ভাষায় কথা বলে থাকলেও অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলা বা বাগানিয়া ভাষায় কথা বলে থাকে। এ ছাড়া যারা উড়িয়া বা কুইভ ভাষায় কথা বলতে পারেন না, তারা মূলত চা–বাগানিয়া ভাষায় কথা বলে।
পাত্রদের ভাষার নাম ‘লালেংথার’।
পাত্ররা তাদের দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষা অনুশীলন করে আসছে। শিশু এবং বয়স্করা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে। কিন্তু লালেংথার ভাষায় যেহেতু কোনো বর্ণমালা নেই, তাই এই ভাষা মৌখিকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু পাত্ররা বাংলা স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ ব্যবহার করে তাদের লালেংথার ভাষা লিখে থাকে। সিলেটের ৩১টি গ্রাম ও চা-বাগানে প্রায় ৬৩৭টি পাত্র পরিবার বাস করে।
সিলের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত। পাত্র সম্প্রদায় তাদের মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে একটি উদ্যোগ হলো পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ (পাসকপ) গঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে নানা উন্নয়নমূলক কাজ হয়। এর মধ্যে একটি কাজ হলো, শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান কর্মসূচি।
সিলের গবেষক মাইফুল আরা বলছিলেন, ‘পাত্রদের ভাষা রক্ষায় কিছু উদ্যোগ থাকলেও এই ভাষার বর্ণমালা না থাকায় এটি হুমকির মুখে। এই ভাষা রক্ষায় তৎপরতা এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষদেরই আছে। এখানে সরকারের উদ্যোগ দরকার।’
‘খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি আমার ভাষাটি হারিয়ে যাচ্ছে। এই ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে এসেছে; কারণ, এই ভাষায় কথা বলার মানুষ কমে গেছে। বেশির ভাগ মানুষ দেশত্যাগ করে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে গেছে।’
কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুববিষয়ক সম্পাদক রিপন বানাই। দেশের তিন উপজেলার সাত গ্রামে প্রায় ৭৭টি বানাই পরিবার আছে। বানাইরা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলে। বানাই ভাষা শুধু মুখে মুখে ব্যবহৃত হয়, তাদের বর্ণমালা নেই, তাই তারা লিখতে পারে না। বানাইরা তাদের এই বানাই ভাষা বলে যখন তারা ঘরে থাকে। এমনকি শিশুরাও নিজেদের মধ্যে বানাই ভাষায় কথা বলে। বানাইরা তাদের মাতৃভাষায় প্রার্থনা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের সময় এই ভাষা ব্যবহার করে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বয়রাতলী এবং মোহনপুর দুটি বানাই গ্রাম। এর পাশাপাশি ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় কয়েকটি গ্রামে তিন–চারটি করে বানাই পরিবার আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এ ভাষার নানা গল্প, উপকথাও হারিয়ে যায়। যেগুলো একটি ভাষার শুধু নয়, একটি দেশেরও অমূল্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়।’
বানাই ভাষায় নানা গল্প, ছড়া ও কবিতা এখন প্রায় কেউ জানে না। এসব হারিয়ে যাওয়ার মুখে। রিপন বানাই বলছিলেন, ‘আমার পরিবারে আমার মায়ের বড় বোন; উনিই এখন বানাইদের কিছু রূপকথা জানেন। উনি যখন থাকবেন না আর কেউ জানবেও না।’
সরকার এখন যে পাঁচ ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে, তার মধ্যে দুটি সমতলের এবং তিনটি পার্বত্য অঞ্চলের। শিক্ষকসংকট রয়েছে দুই অঞ্চলেই। এসব ভাষা ছাড়া অন্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নেই। যেসব জনগোষ্ঠী সংখ্যায় কম, তাদের ভাষা সুরক্ষা বেশ কঠিন। কারণ, তাদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা চালানো কঠিন বলে মনে করেন অধ্যাপক সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেবারে বিপন্ন ভাষাগুলোর ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। জরুরি হলো এসব ভাষায় গল্প, ছড়া, উপকথার রেকর্ড রাখা। তবে এভাবে ভাষা জীবন্ত না–ও থাকতে পারে। বড় কাজ হচ্ছে, এসব জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা যেন বাংলা বা ইংরেজি ভাষার প্রভাবে তাদের ভাষার ব্যবহার হারিয়ে না ফেলে সেই ব্যবস্থা নেওয়া। তারা যেন বাড়িতে কথা বলে, সে জন্য ‘গৃহ ভাষার বিকাশ’ নামের কোনো কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। আর সেটা সরকারিভাবেই করতে হবে।’
বিপন্ন ভাষাগুলোর সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান। তাঁর প্রস্তাব, এসব বিপন্ন ভাষার ইউটিউব চ্যানেল হতে পারে। সেখান সাবটাইটেলসহ এসব ভাষায় গল্প, গান থাকতে পারে। এই চ্যানেল তৈরিতে সরকারি–বেসরকারি সহায়তার দরকার হবে বলে মনে করেন তিনি।