
২২৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকার। এতে রয়েছে ভুক্তভোগীদের বর্ণনা ও বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধের প্রমাণ।
গুম কোনো একক দলীয় রাজনৈতিক বিষয় নয়, তা উল্লেখ করে উদাহরণ হিসেবে গুমের শিকার তিনজন ব্যক্তির নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। কমিশন বলেছে, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থ্যানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে এটা সবাইকে আক্রান্ত করেছে।
তিন ব্যক্তির একজন বিএনপির কর্মী। তিনি কমিশনকে বলেছেন, ‘গোপনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার সাথে সাথে আমি সেন্সলেস হয়ে পড়ে যাই ওইখানে। কতক্ষণ শুয়ে আছি জানি না। কিছুক্ষণ পর কানে আওয়াজ শুনতেছি, তারা কথা বলতেছে, “বেঁচে আছে, বেঁচে আছে...”। দাঁড়ানোর পর বলতেছে, “তাকে ঝুলা।...” আবার ঝুলাইয়া, আবার পিটানো।...বলে, “তুই বুঝস না? তুই পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখস।”’
এরপর দেওয়া হয়েছে একজন ছাত্রশিবির কর্মীর ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনা। ছাত্রশিবির কর্মী কমিশনকে বলেছেন, ‘আমাকে ওদের টর্চার রুমটার সামনে রাখত। তো যখনই খুবই হাই ভলিউম মিউজিক বাজত, তখনই আমি বুঝতাম যে কাউকে না কাউকে মারতেছে। এবং তাদের চিৎকারের শব্দ এত বেশি আসত, আসলে আমার তখনই মানে ডেফিকেশনের (মলত্যাগ) চাপ চলে আসত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কন্টিনিউয়াস দুই মাস চোখ বাঁধা ছিল। ওরা চোখ বেঁধে রাখার কারণে আমার চোখে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। মনে হচ্ছে সবকিছু ছিঁড়ে যাবে।...পরে যখন আমি বের হলাম, তখন আমার চোখে অপারেশন করা হয়। মানে এই চোখে রেটিনা এন্ডিং যেটা, এটা ছিঁড়ে যায়।’
গুমের শিকার একজন ছাত্রীর ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে ওই ছাত্রী বলেন, ‘অনেকটা ক্রুসিফায়েড হওয়ার মতো করে হাত দুই দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখছে। ওরা আমাদের ওড়না নিয়ে নিছিল; আমার গায়ে ওড়না ছিল না। আর যেহেতু জানালার দিকে মুখ করা ছিল, অহরহ পুরুষ মানুষ যে কতগুলা আসছে দেখার জন্য, এটা বলার বাহিরে। মানে তারা একটা মজা পাচ্ছে। বলাবলি করতেছিল যে “এমন পর্দাই করছে, এখন সব পর্দা ছুটে গেছে।”’
ছাত্রী আরও বলেন, ‘আমার পিরিয়ড হওয়ার ডেট ছিল অনেক লেটে। কিন্তু যেই টর্চার করে, তাতে আমি এত পরিমাণ অসুস্থ হয়ে যাই যে সাথে সাথে আমার পিরিয়ড আরম্ভ হয়ে যায়। তারপর ওনাদেরকে বলি যে আমার তো প্যাড লাগবে। এটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করে ওরা।’
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ২২৯ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর আগে বিভিন্ন সময় প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রকাশ করা হয়েছিল।
গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছে কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (হাই প্রোফাইল) গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত), তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান (মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে গুমের সঙ্গে জড়িত র্যাবে কর্মরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তা এবং ডিজিএফআই, এনএসআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন কর্মকর্তার অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।
কমিশন জানায়, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
সব মিলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে ২২২ জন ব্যক্তি কমিশনের সামনে হাজির হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ১০০, পুলিশের ৯৮, বেসামরিক ১০, বিমানবাহিনীর ৫, বিজিবির ৫, নৌবাহিনীর ৩ ও কোস্টগার্ডের ১ জন রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি কমিশন গুমের শিকার ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে ৭৬৫ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
এ ছাড়া সীমান্ত পার করে যাঁদের ভারতে পাঠানো হয়েছে, তাঁদের ঘটনাগুলোও পরীক্ষা করেছে কমিশন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। তারা ভারতীয় কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের প্রথমে ১ হাজার ৫২ জন এবং পরে ৩ হাজার ২৮৫ জনের তালিকা দিয়েছে। তবে যেসব ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁদের কারও নাম ভারতের দেওয়া তালিকায় পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বিভিন্ন সময়ে যাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে, তাঁদের বিষয়েও পুলিশ ও বিজিবির কাছ থেকে তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা করেছে কমিশন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই সরকারের সময়কার গুমের ঘটনা তদন্তে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর প্রধান হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।