আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ সোমবার চানখাঁরপুল হত্যা মামলার রায়ের পর ছেলের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ সোমবার চানখাঁরপুল হত্যা মামলার রায়ের পর ছেলের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান

৩ বছরের সাজা কি যৌক্তিক, প্রশ্ন শহীদ আনাসের মায়ের

তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হলেও তিন আসামির কারাদণ্ডের রায়ে ক্ষুব্ধ শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় নিয়ে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলা আজ সোমবার রায়ের পর সানজিদা খান তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘সন্তানের যে খুনি, তার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও ৩ বছরের যদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তা কি আসলেই যৌক্তিক কোনো রায় হয়েছে বলে আপনারা মনে করেন?

‘আমি তা মনে করি না। আমি আমার সন্তান হারাইছি। সব প্রমাণ দেওয়ার পরও যদি তিন বছরের সাজা হয়...’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি চালিয়ে হত্যা মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

শাহারিয়ার খান আনাস

বাকি আসামিদের মধ্যে ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলের ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। চার বছরের কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনের। সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে তিন বছর করে কারাদণ্ড। আসামিদের মধ্যে চারজন পলাতক। তাঁরা হলেন হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল ও ইমরুল। গ্রেপ্তার আছেন আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল।

রায় ঘোষণার পর শহীদ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা কি কোনো সাজা হলো?’

অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে নেমেছিল পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনাস। ওই দিন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগে চানখাঁরপুলে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। তাতে ১৬ বছর বয়সী আনাসসহ ছয়জন নিহত হন। অন্যরা হলেন শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের মামলাটির রায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় রায় হলো। গত বছরের ১৭ নভেম্বর দেওয়া প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে রাজসাক্ষী হওয়ায় অপর আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের সাজা।

শহীদ আনাসের চিঠি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়েছিলেন আনাস। তার পকেটে একটি পুরোনো ছোট মুঠোফোন ছিল। সেখান থেকে নম্বর নিয়েই সানজিদা খানকে ফোন করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) যেতে বলেছিলেন আন্দোলনকারীদের একজন।

মা গিয়ে পান ছেলের লাশ। আনাসের বুকের বাঁ পাশে গুলি লেগেছিল। ছেলের মরদেহ কোলে নিয়ে ব্যাটারিচালিত একটি রিকশায় ঘরে ফেরেন আনাসের মা–বাবা। আনাসের লাশ নিয়ে সেদিন বিক্ষোভ হয়েছিল গেন্ডরিয়ায়। পরে জুরাইন কবরস্থানে দাদির কবরে তাকে দাফন করা হয়। স্থানীয়রাই পুরান ঢাকার দীননাথ সেন রোডের নাম পাল্টে ‘শহীদ আনাস সড়ক’ করেন।

প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নে থাকা আনাস বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের জন্য একটি চিঠি রেখে গিয়েছিল। তার সেই চিঠি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল আদালতে। পুরান ঢাকার সাধনা ঔষধালয়ের দেয়ালে চিঠিটি স্থান পেয়েছে গ্রাফিতির সঙ্গে।

সেই চিঠিতে আনাস লিখেছিল, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। সরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য কোরে বের হোলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বোসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধি কিশোর, ৭ বছরের বাচ্চা, ল্যাংরা মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন বোসে থাকবো ঘড়ে। একদিন তো মরতে হবেই।’

আনাস আরও লিখেছিল, মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, সে–ই প্রকৃত মানুষ।

আনাসের সেই চিঠি গ্রাফিতিতে

ছেলের জন্য মায়ের হাহাকার

সানজিদা খান বিভিন্ন সময় প্রথম আলোর কাছে তাঁদের মা ও ছেলের গল্প বলেছেন। ছেলেকে নিয়ে গল্পগুলো নিজের ফেসবুক ওয়ালেও লিখে রাখছেন তিনি।

১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সানজিদা খানের। এরপর ২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন প্রথম সন্তান আনাসের জন্ম। প্রথম সন্তান বলে অনুভূতিটাও ছিল অন্য রকম। সেই ছেলেকে হারানোর কষ্টটা মানতে পারছেন না তিনি।

আনাস গুলিবিদ্ধ হয়ে যেদিন মারা গিয়েছিলেন, সেদিন ছিল সোমবার। সেই থেকে প্রতি সোমবার রোজা রাখেন মা সানজিদা। বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ প্রতিদিন আনাসের জন্য দুই রাকাত নামাজ পড়েন।

ছেলে হারানোর কততম দিন, কততম সোমবার, তার হিসাব ফেসবুকে রাখেন সানজিদা। সে হিসাবে আনাসকে হারানোর আজ ছিল ৫৪০তম দিন, ৮৩তম সোমবার। আনাস যখন মারা যায়, তখন তার ভাই সাফওয়ানের বয়স ছিল পাঁচ বছর, আর সুফিয়ানের ছিল দুই বছর।

পুরান ঢাকার দীননাথ সেন রোডের নাম পাল্টে করা হয়েছে ‘শহীদ আনাস সড়ক’

দুই ঈদের দিন আর নিজের জন্মদিন সবচেয়ে পছন্দের ছিল আনাসের। ঈদের আগে মায়ের জন্য মেহেদি কেনা, বাবা ও ভাইদের নিয়ে ঈদের নামাজে যাওয়া, মা কী রান্না করছেন, তার তদারকি করা, এরপর একসঙ্গে খাওয়া ছিল আনাসের প্রিয় কাজ। আনাস মারা যাওয়ার পর এখন আর এদিনটি ঘিরে কোনো আয়োজন করা হয় না তার পরিবারে।

মারা যাওয়ার আগে আনাসের ফেসবুকের কভার ফটোতে বাবা, মা, দুই ভাইয়ের সঙ্গে ছবির পাশে লেখা ছিল ‘ব্লাডি জুলাই’। ছেলে মারা যাওয়ার পর সানজিদা তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমার আনাসের ব্লাডি জুলাই আমার আনাসকে রক্তাক্ত করেছে। আমাকে করেছে শহীদজননী।’

গত বছরের ১৪ এপ্রিল সানজিদা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাইরের রঙিন জীবনটা দেখলে মনে হয় আমাদের জীবনটাও তো এমন রঙিন ছিল। আমার সন্তানের শূন্যতা পৃথিবীর সকল পূর্ণতার কাছে হার মানে বারবার।...আনাস বাপ তোকে ছাড়া কিছু নেই, না ঈদ না নববর্ষ, আছে শুধু হাহাকার।’

শহীদ আনাসের মা সানজিদা খানের ফেসবুকে লিখে রাখছেন তার বেদনার গল্প।

আনাসের কথা মনে করে তার পছন্দের নুডলস খাওয়া বাদ দিয়েছেন সানজিদা। ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে মায়ের সঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খেত। ছেলে নেই, তাই মায়ের আর সেভাবে দুপুরের খাওয়া হয় না।

সানজিদা খানের আক্ষেপ, ‘আমার একটা তুই (আনাস) ছাড়া জীবনটাই পুরা ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। এখন আর জীবন নিয়ে তেমন কোনো আয়োজন নেই।’

কখন বছর শুরু হয়, কখন শেষ হয়, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ এখন পান না সানজিদা। কিন্তু এরপরও ভাবনাগুলো এসেই যায়। তীব্র গরমের সময় মনে হয়, আনাস তো গরম একদম সহ্য করতে পারত না, এখন তাহলে কেমন করে কবরে থাকছে? অন্ধকারেই বা থাকছে কেমন করে? বৃষ্টি হলে মনে হয়, ছেলের কানে কি পানি ঢুকে যাচ্ছে নাকি?

ছেলে হারানোর শোক বয়ে চলেছেন সানজিদা খান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনকে হত্যার মামলায় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়

সরকারি উদ্যোগে আনাসের কবর বাঁধানো হয়েছে। সানজিদা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ছেলের কবর সোনা দিয়ে বাঁধাই করলেও মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। এই রাষ্ট্রেরই তো আরেক ফ্যাসিস্ট সরকার তাঁর সন্তানের ঘাতক ছিল।’

সানজিদা জানান, তাঁর ছোট ছেলে সুফিয়ান রাস্তায় বের হয়ে ব্যানারে ভাইয়ের ছবি দেখে ডাকে, ‘আনা আইসা পরো।’ আরেক ভাই সাফওয়ান ভাইয়ের হাত ধরে বড় হতে চায়।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাতে আনাসসহ পরিবারের সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছে। এটাই ছিল আনাসের সঙ্গে শেষ খাওয়া। গত বছরের ৫ আগস্ট সানজিদা খান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘১২ মাস, এক বছর, ঘরের ছেলে ঘরে ফেরে না আজকে এক বছর।...মানুষ মানুষকে এইভাবে মারে?’

ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায়ের পর গত বছরের ১৭ নভেম্বর সানজিদা ফেসবুকে লেখেন, ‘একজন মা হয়ে হাজার মায়ের বুক খালি করা হাসিনার ১ হাজার ৪০০ বার ফাঁসি হলেও কম হবে।’