‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে

করুণার আসন নয়, সংসদে নারীর সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে রাজনৈতিক দলগুলো ‘দাদি–চাচিদের’ মনোনয়ন দেয়। যে পুরুষ জাতীয় নির্বাচনে হেরে যান, ‘সান্ত্বনা’ হিসেবে তাঁদের স্ত্রীদের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে এসব আসনে নারীদের সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। তাঁরা সংসদে এখন আর করুণার আসন চান না। দয়ার আসন চান না। তাঁরা চান, সংসদে নারীর সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথাগুলো বলেন ফরিদা আখতার। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজক নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম।

ফরিদা আখতার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসন দাদি–চাচিদের জন্য রাখে। যে পুরুষেরা নির্বাচনে হেরে গেছেন, তাঁদের স্ত্রীদের সংরক্ষিত আসন দিয়ে সান্ত্বনা দেয়। এগুলো অনেকভাবেই দেওয়া হয়।

ফরিদা আখতার মনে করেন, নির্বাচনে মনোনয়নের সময় যদি রাজনৈতিক দলগুলো ৩০ শতাংশ নারীদের মনোনয়ন দেয়, তাহলে একটা সময় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের আর দরকার হবে না।

যেসব নারী দল থেকে মনোনয়ন না পেয়েও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাঁদের অভিনন্দন জানান ফরিদা আখতার।

রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের কম মনোনয়ন দিলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) কেন চুপ ছিল, সে প্রসঙ্গে নারীদের কথা বলার আহ্বান জানান ফরিদা আখতার।

সংরক্ষিত আসনে যেসব নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাঁদের নির্বাচনী এলাকা বলে কিছু থাকে না বলে উল্লেখ করেন ফরিদা আখতার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই নারীরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করেন? কার স্বার্থ তুলে ধরেন?

সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের যে পদ্ধতি, তার বিরোধিতা করেন ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, ‘...এখন আর আমরা করুণার আসন চাই না। দয়ার সিট চাই না।...আমরা চাই সত্যিকারের নারীর প্রতিনিধিত্ব।’

এ বিষয়ে প্রয়োজনে মামলা করার হুঁশিয়ারি দেন ফরিদা আখতার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ক্ষুব্ধ নারী সমাজের ঋতু সাত্তার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দলে কোনো নারী সদস্য নেই। এ ব্যাপারে তিনি নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে নিন্দা জানান।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলাপ ছিল। কিন্তু নারীর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকারের ইঞ্জিনিয়ারিং ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানান ফারাহ কবির। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বুলিং ও হেনস্তা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বৈশ্বিকভাবে কাজ করতে হবে। ফেসবুকসহ অন্য বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব হেনস্তা নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি রাখেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তার শিকার হলেও নারীরা যাতে থেমে না যান, সেই আহ্বান জানান তিনি। নারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান ফারাহ কবির।

অনুষ্ঠানে অংশ নেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হওয়া নারীরা। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ কম। তাই নারীরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাজেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের আগ্রহ কম থাকার বিষয়ে তাসনিম জারা বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রকট। অন্যদিকে, পুরুষেরা বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে পারে। অনলাইনে নারী প্রার্থীদের ভয়াবহ সাইবার আক্রমণের শিকার হতে হয়। কাজেই এই দিকগুলো নারীদের নির্বাচন করা থেকে নিরুৎসাহিত করে। ফলে এই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সবাইকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন ও নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সাজ সিদ্দিকী। বিভিন্ন অঙ্গনে যাঁরা নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন, তাঁরা যাতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নারীর রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখেন, সেই আহ্বান জানান ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহিন সুলতান বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আন্দোলন স্বাধীনতার পর থেকে চলমান। এখনো সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির আন্দোলন একইভাবে করতে হচ্ছে। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি কেন আসলে একজন নারী প্রার্থী দল থেকে মনোনয়ন পাচ্ছেন না, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশন কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, সে ব্যাপারে গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার, যাতে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়।

শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা অভিযোগ করেন, নির্বাচনে তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খুঁজে পাননি। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দিয়েও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।

রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব কম ছিল বলে মন্তব্য করেন ঢাকা–১২ আসন থেকে নির্বাচন করা গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার। তিনি বলেন, নির্বাচনে নারী প্রার্থী বাড়াতে নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। যেকোনো বাধা মোকাবিলার মানসিকতা লালন করতে হবে।

নির্বাচন কমিশন সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে নির্বাচন করা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব। তিনি বলেন, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য রাজনীতি করেন, তাঁরা বর্তমান নির্বাচনব্যবস্থায় কখনো সংসদে যেতে পারেন না। এখানে অর্থের ছড়াছড়িসহ কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাবে, সেটা অনেক বড় ভূমিকা রাখে। নারী প্রার্থীদের জন্য সেটা আরও বড় প্রতিবন্ধকতা।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা-৫ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা–১০ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বহ্নি বেপারী, ঢাকা-১১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি, ঢাকা-৭ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী সীমা দত্ত, ঢাকা-২০ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির ( এনসিপি) প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ প্রমুখ।