বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে বলে মনে করেন ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইস। তাঁর মতে, এই মুহূর্তটি পরিবর্তনের বড় সুযোগ। তিনি বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড ভালো না হলেও এই মুহূর্তটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুজান ভাইস এ কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই)। এতে সারা দেশের সাড়ে চারশর বেশি সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সুজান ভাইস বলেন, গত দুই বছরে গণমাধ্যম নিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, এমআরডিআই, ইউএনডিপি ও ইউনেস্কোর রিপোর্টসহ বিস্তর বিশ্লেষণ ও আলোচনা হয়েছে। এখন বিশ্লেষণের পর্যায় পেরিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। বর্তমান সরকার আলোচনায় আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছে, ফলে এই সুযোগ এখনই কাজে লাগাতে হবে। সুজান ভাইস বলেন, সাংবাদিকরাই গণমাধ্যম। তাঁদেরকেই এই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হতে হবে এবং পরিবর্তনের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে। অপতথ্য মোকাবেলা এবং বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজের সব কণ্ঠস্বর দেশের ভবিষ্যৎ সংলাপে যুক্ত হতে পারবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ঝুঁকির সম্মুখীন। গত এক দশকে সারা বিশ্বে কমপক্ষে ৫০০ সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ গত ১৭ বছর, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে ছিল। সেই সময়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান আশা প্রকাশ করেন, এই সম্মেলনের উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা বেরিয়ে আসবে। জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আজ যতটা অপরিহার্য, ততটাই ভঙ্গুর বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে তথ্য পরিবেশ এখন গভীর সংকটে। মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষয় পাচ্ছে এবং সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের কাজ শুধু মূল্যবান নয়, অপরিহার্য।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে নিকোলাস উইকস বলেন, এটি শুধু সাংবাদিকদের সুবিধা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ যখন সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করে, তখন তারা শুধু গণমাধ্যমকে নয়, জনগণের জানার অধিকারকেই আক্রমণ করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাচ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব এবং বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংকটময় সময়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। এমিলিয়া দিয়াজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অপতথ্য আজ সারা বিশ্বের নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ক্ষমতাধরদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের এই সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হলে কমিউনিটির শক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ের বিকল্প নেই।
স্বাগত বক্তব্যে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গণমাধ্যম বাইরের কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। নিউজরুমের নিজস্ব নীতি ও নৈতিকতার আলোকে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার একমাত্র পথ।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সর্বশেষ সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম উল্লেখ করে হাসিবুর রহমান বলেন, এই অবস্থার উন্নয়নে করণীয় নিয়ে কনফারেন্সের সেশনগুলোতে আলোচনা হবে।