সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন (সেরাদের সেরা) হয়েছেন মো.মুহতাদ আছরার। ১১ এপিল
সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন (সেরাদের সেরা) হয়েছেন মো.মুহতাদ আছরার।  ১১ এপিল

জাতীয় গণিত উৎসবে পুরস্কার বিতরণ

গণিতের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে, চর্চা থাকতে হবে

জাতীয় গণিত উৎসব ২০২৬–এ সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন (সেরাদের সেরা) হয়েছেন মো.মুহতাদ আছরার। অতিথিদের কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে ‘ট্রফি’ গ্রহণের সময় তার চোখেমুখে ছিল হাসি ও আত্মবিশ্বাস।

রাজধানীর প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) আজ শনিবার সকালে পুরস্কার গ্রহণ শেষে মুহতাদ আছরার প্রথম আলোকে বলে, গণিতের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। একাডেমিকের বাইরেও গণিত পড়তে হবে। নিয়মিত চর্চার মধ্যেও থাকতে হবে। তাহলেই গণিতে ভালো করা সম্ভব।

মুহতাদ আছরার চট্টগ্রামের বিজিসি একাডেমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম থেকে একাই পুরস্কার গ্রহণ করতে এসেছে সে। মুহতাদ বলে, এমন সাফল্যের পর পুরস্কার পাওয়া সত্যিই আনন্দের।

ডাচ্–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো জাতীয় গণিত উৎসব ২০২৬–এর আজ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে গণিত উৎসব জাতীয় অলিম্পিয়াড পর্বে বিজয়ী ৮৭ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

ট্রফি হাতে চার ক্যাটাগরিতে চার চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’। পেছনে অতিথি ও আয়োজকেরা

এবার প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ হয়েছে ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের মো.নবিহ হোসেন। জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ হয়েছে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের রিশান আন নাফি। সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছেন মো.মুহতাদ আছরার। হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের তাসিন খান।

প্রাইমারি ক্যাটারগিতে মেয়েদের মধ্যে সেরা হয়ে ‘জেবুন্নেসা হাশেম পুরস্কার’ পেয়েছে পরশমণি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থী সম্পূর্ণা সাহা। জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ‘জামিলুর রেজা চৌধুরী নান্দনিক সমাধান’ পুরস্কার পেয়েছে ইসমাম উদ্দিন। সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য অলিম্পিয়াড হয়ে ‘জামাল নজরুল ইসলাম স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে তাসিন খান। প্রাইমারি ও জুনিয়র ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ান অব দ্য অলিম্পিয়াড হয়ে ‘জামিলুর রেজা চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ পেয়েছে মো. নবিহ হোসেন।

‘আবিদ রেজা স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী আবরার জাহিন পাঠান। ‘এম সেকেন্দার আলি স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে রাজশাহীর মসজিদ মিশন একাডেমির শিক্ষার্থী টি এম আহাদ। ‘গৌরাঙ্গ দেব রায় স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মো. জামিউল হোসেইন। ‘সজল-কাজল স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী অরিজিৎ সাহা, ‘প্রকৌশলী লুৎফর রহমান স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মারজুক রহমান এবং ‘খোদাদাদ খান স্মৃতি’ পুরস্কার পেয়েছে চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী।

আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার দেশের ৪৭৯টি উপজেলার ১৯ হাজার ৭৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী অনলাইনে নিবন্ধন করেছিল। নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে প্রথমে অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড থেকে ১৭ হাজার ১৬০ শিক্ষার্থী বিজয়ী হয়। এই বিজয়ী শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশের ১২টি শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসবের আয়োজন করা হয়। আঞ্চলিক পর্ব থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী বিজয়ী হয় এবং তাদের নিয়ে জাতীয় গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয় গত ৭ মার্চ। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যায়। খাতা মূল্যায়ন শেষে ৮৭ জনকে বিজয়ী করে গত ১৪ মার্চ ফলাফল অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। তারপর আজ বিজয়ীদের হাতে ট্রফি, সনদ, ক্রেস্ট, মেডেল ও টি–শার্ট তুলে দেওয়া হয়।

‘যারা পুরস্কার নিচ্ছ, তোমরা প্রমাণ করেছ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারো’

রাজধানীর পিটিআইয়ে আজ সকাল ১০টার পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় গণিত উৎসবের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কথা বলেন আগত অতিথিরা।

বক্তব্য দেন ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম । ১১ এপ্রিল

গণিত অলিম্পিয়াড করা বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা সারা পৃথিবীতে ভালো করছে বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা গণিতের সৌন্দর্য উপলব্ধি করবে। ভালো গণিতবিদ হবে। পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে। বড় স্বপ্ন দেখবে।

গণিত অলিম্পিয়াডে সম্পৃক্ত সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আনিসুল হক বলেন, তোমরা এমন কিছু করবে, যেন বাংলাদেশ শুধু টাকায় নয়; ধনে, মানে, জ্ঞানে ও মর্যাদায় এগিয়ে যায়। বাঙালি–অবাঙালি, মুসলমান–অমুসলমান, নারী–পুরুষ সবাই মিলে এই দেশ, এই পৃথিবী। দেশ ও পৃথিবীকে সুন্দর করতে হবে।

২৬ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম জাতীয় গণিত উৎসবের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আলাদাভাবে করা হলো বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান। তিনি বলেন, গণিত অলিম্পিয়াডে এ বছর ৫২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৮৭ জন বিজয়ী এখানে এসেছ। তোমরা অগ্রদূত। তোমাদের নিজেদের জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

অভিভাবকদের উদ্দেশে মুনির হাসান বলেন, ছেলেমেয়েদের বেশি চাপাচাপি না করাই ভালো। প্রযুক্তির কারণে ওদের কাছে অনেক ধরনের সুযোগ আছে এখন। সুযোগগুলো যেন ওরা এক্সপ্লোর করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ওরা যেন ডিভাইসে (মুঠোফোনের মতো যন্ত্র) আসক্ত হয়ে না যায়।

জাতীয় গণিত উৎসবের বিজয়ীরা। সঙ্গে রয়েছেন অতিথিরা। ১১ এপ্রিল

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, গণিত অলিম্পিয়াড যখন শুরু হয়, তখন শিক্ষার্থী সেভাবে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে ২২২ জন অংশগ্রহণ করেছিল। এবার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে প্রায় ৫২ হাজার। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ আছে, অংশগ্রহণ করছে। যারা অতীতে অংশগ্রহণ করেছে, তারা ভালো করছে। হার্ভার্ড, এমআইটির মতো বিশ্বনন্দিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আজ তোমরা যারা এখানে পুরস্কার নিচ্ছ, তোমরা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় জেতোনি, প্রমাণ করেছ তোমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারো, অধ্যবসায় ধরে রাখতে পারো এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারো।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করে গণিত শিক্ষায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২০০৪ সাল থেকে ডাচ্–বাংলা ব্যাংক নিয়মিতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে এই গণিত উৎসবে। ছেলেমেয়েরা কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডেও ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করে আসছে।

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস বক্তব্য দেন। ১১ এপ্রিল

এ সময় আরও বক্তব্য দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক রিজওয়ানা রিয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো.শফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক প্রশিক্ষক রাজিয়া বেগম, টালিখাতার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত উল্লাহ্ খান, রিভ সিস্টেমসের পরিচালক আজমত ইকবাল সজল এবং ঢাকা পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট মো.ওমর আলী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন অনিক সূত্রধর। ১১ এপ্রিল

অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন অনিক সূত্রধর। গান শেষে বিজয়ীদের গলায় মেডেল তুলে দেন অতিথিরা। বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণীর মধ্য দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠান শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গণিত অলিম্পিয়াডের একাডেমিক কাউন্সিলর জাহিদ হোসাইন খান।