
রাজধানী ঢাকায় শিশু–কিশোরদের জন্য নতুন খেলার মাঠ কিংবা পার্ক তৈরির কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে নগরীতে উন্মুক্ত জায়গা কমিয়ে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে সরকার।
পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, এ কারণে ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য যে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) তৈরি করা হয়েছিল, তা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ভবনের কনফারেন্স হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদেরা এই অভিযোগ করেছেন। ‘ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ: বিআইপির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বিআইপি।
সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদেরা বলেন, ঢাকার সমস্যাগুলো কমিয়ে পরিকল্পিত শহর গড়তে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) তৈরি করেছিল। ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট সরকার তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এক বছরের মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরে তা সংশোধন করা হয়। এর আগে রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ড্যাপের (২০১৬–২০৩৫) খসড়া ২০২০ সালে প্রকাশ করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেবল ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করতে আবারও ড্যাপ সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড্যাপের প্রস্তাবনায় ঢাকা শহরে প্রায় কয়েক শ খেলার মাঠ ও পার্কের কথা বলা হয়েছিল উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিআইপির সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গেজেট প্রকাশিত হওয়ার তিন বছরে এখন পর্যন্ত একটি খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরি করা হয়নি। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার খোলা জায়গা কমিয়ে ভবনের উচ্চতা বাড়াতে আবারও এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজউক সূত্র বলছে, দ্বিতীয়বারের মতো ড্যাপ সংশোধনের প্রস্তাবটি শিগগির উপদেষ্টা পরিষদে যাবে। সেখানে অনুমোদন পেলে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
বিআইপির সভাপতি বলেন, ড্যাপ আবার সংশোধনে সরকারের উদ্যোগ অনেকটাই এগিয়েছে। মূলত আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবির কাছে সরকার রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মতামত ও দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার এই সংশোধনের পথে হাঁটছে। এতে জনবহুল ঢাকা শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়বে এবং এরই মধ্যে স্থবির হয়ে যাওয়া শহরে পরিবহন, পরিষেবাসহ সব ধরনের নাগরিক সেবার ওপর অসহনীয় চাপ পড়বে। এই চাপ বহন করার ক্ষমতা এ শহরের নেই। এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকার বাসযোগ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআরের মান নির্ভর করে এলাকার বৈশিষ্ট্য, প্লটসংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা, এলাকার নাগরিক সুযোগ–সুবিধা ও পরিষেবার ওপর। এলাকাভেদে এফএআরের মান ভিন্ন হবে।
কত মানুষ মারা গেলে সবার বোধোদয় হবে, এই প্রশ্ন তুলে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ১০ ফুট সড়কের পাশে যদি ১০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়, ওই ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাবে কীভাবে? তাই সরকার তাঁদের পরামর্শ না শুনলে ঢাকা শহর বাঁচানোর স্বার্থে প্রয়োজনে তাঁরা আদালতে যাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সহসভাপতি সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, আগামী ১০ বা ২০ বছর পর ঢাকায় কত মানুষ থাকবে, তা সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে। এরপর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করে ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে লোকসংখ্যা আরও বাড়ানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন আরও বলেন, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক না থাকায় শিশু–কিশোরেরা বন্দী ঘরে মুঠোফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যের ঝুঁকিসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সরকার এসব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ভবন কতটা উঁচু করার যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অগ্নিদুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। ছয়তলার উঁচু ভবনকে বহুতল ভবন বিবেচনায় নিতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধনী এনে ভবনে অগ্নিনিরাপত্তামূলক প্রতিরোধকব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সুবিধা, যেমন স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির যে প্রস্তাবনা দেওয়া আছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপির যুগ্ম সম্পাদক তামজিদুল ইসলাম, বোর্ড সদস্য আবু নাঈম সোহাগ ও ফাহিম আবেদিন।