৯ বছর বয়সে এই পার্সিয়ান বিড়াল ম্যাক্স কিডনি জটিলতায় মারা যায়
৯ বছর বয়সে এই পার্সিয়ান বিড়াল ম্যাক্স কিডনি জটিলতায় মারা যায়

সন্তানসম পোষা বিড়াল ম্যাক্সের জন্য সমাধি বানিয়েছেন এরিকা

ফেসবুক, ইউটিউব আর টিকটকে ‘বাটুল অ্যান্ড ম্যাক্স’ নামটি হয়তো অনেকেরই পরিচিত। এই পরিচিতির কেন্দ্রে আছেন এরিকা কঙ্কন রায়। বাটুল ও ম্যাক্স-দুটি বিড়াল। আর এরিকার কাছে বিড়াল দুটি কেবল পোষা প্রাণী নয় বরং সন্তানসম। সন্তানের মতোই দেখভাল করতেন তাদের।

কিন্তু এরিকার জীবনে সন্তান হারানোর মতো শূন্যতা এসে হাজির হয়েছিল ৯ অক্টোবর। সেদিন তাঁর আদরের পার্সিয়ান বিড়াল ম্যাক্স কিডনি জটিলতায় মারা যায়। বয়স হয়েছিল ৯ বছর। প্রিয় বিড়ালকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এরিকা ও তাঁর স্বামী সনি সাহা সিদ্ধান্ত নেন, ম্যাক্সের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি সমাধি বানাবেন। গত নভেম্বরে সেই সমাধির নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ নিয়ে অনলাইনে নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তিনি।

‘বাটুল অ্যান্ড ম্যাক্স’: সন্তানতুল্য ভালোবাসা

অনলাইনে ম্যাক্স বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে এরিকা যখন ডাক দিতেন, ম্যাক্স এমনভাবে মুখ দিয়ে শব্দ করত যা শুনে মনে হতো ‘মা’ বলেই ডাকছে এরিকাকে। এরিকা ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে ‘এই আমার কাহিনি’ শিরোনামে ম্যাক্সের দৈনন্দিন জীবনের গল্পও লিখে রাখছেন।

এরিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ম্যাক্স পার্সিয়ান বিড়াল। অনেকেই ভাবেন, অনেক দাম দিয়ে কেনা বলেই হয়তো ম্যাক্সের প্রতি ভালোবাসাটা একটু বেশি ছিল। ম্যাক্সকে আমরা কিনিনি। আর আমার কাছে বিড়াল দেশি না বিদেশি তা কোনো বিষয় নয়। ম্যাক্স আমার কথা বা আমার কষ্টগুলো অনুভব করতে পারত। আমি কান্নাকাটি করলে পাগলের মতো আচরণ করত। আমার কষ্ট দূর করার চেষ্টা করত।’

এরিকা সন্তানের মতোই দেখভাল করতেন ম্যাক্সের

ম্যাক্স অসুস্থ হয়ে পড়লে দেশের নামকরা প্রাণী চিকিৎসকদের দেখানো হয়েছিল। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে সে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে কলকাতার এক চিকিৎসকের পরামর্শে অনলাইনে চিকিৎসা শুরু হয়। কলকাতা থেকে কিডনির ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট ও খাবার আনিয়েছেন এরিকা; কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না।

এরিকার আক্ষেপ, উন্নত দেশের চিকিৎসায় ক্রনিক কিডনি রোগ নিয়েও বিড়াল দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে; কিন্তু ম্যাক্সের ক্ষেত্রে তা হলো না।

এরিকা বলেছেন, ম্যাক্সের মৃত্যুর পর এরিকা বাটুলেরও শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনির সমস্যা ধরা পড়েছে। কলকাতার চিকিৎসকের অধীন তার চিকিৎসা চলছে। বাটুল ১১ বছর বয়সী দেশি জিঞ্জার বিড়াল।

বরিশালে ম্যাক্সের সমাধি

ভালোবাসার নির্দশন সমাধি

এরিকা ও তাঁর স্বামী সনি সাহা ঢাকায় থাকেন। ম্যাক্স ঢাকায় মারা যাওয়ার পর তাঁরা মৃতদেহ বরিশালে নিয়ে যান। সেখানে নিজেদের কেনা জমিতে খ্রিষ্টধর্মীয় রীতিতে সমাধি করেছেন তাঁরা। গত নভেম্বরে সমাধির কাজ শেষ হয়েছে।

কালো বেদির ওপর সাদা ধবধবে সমাধিতে রয়েছে ম্যাক্সের ছবি। পাশে ইংরেজিতে ২০১৭, ৯ অক্টোবর ২০২৫–এর নিচে লেখা, ‘ফরএভার ইন আওয়ার হার্টস’। আর বাংলায় লেখা হয়েছে, ‘তুমি মা বলে ডাকো’।

এরিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনলাইনে অনেকেই বলছেন, মানুষের জন্য কিছু না করে লোকদেখানোর জন্য, ভিউ কামানোর জন্য এগুলো করেছি। কেউ কেউ বলেন, মানুষ না খেয়ে থাকে আর আমরা আছি বিড়াল নিয়ে। সমাধিতে ক্রুশচিহ্ন দেখেও অনেকে কটূক্তি করছেন। তবে আমরা জানি, কিছু মানুষ অবলা প্রাণীকে হিংসা করেন।’

তবে সমালোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এরিকার পোস্ট করা ম্যাক্সের সমাধির ভিডিও বা অন্যান্য পোস্টে অধিকাংশ মানুষই এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। সন্তানহারা একজন মা হিসেবে এরিকার প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছেন।

বাটুলের জন্মদিনের আয়োজনে ম্যাক্স ও বাটুলকে নিয়ে এরিকা ও তাঁর স্বামী সনি সাহা

ম্যাক্সকে যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল

ম্যাক্স রাজধানীর ধানমন্ডিতে অন্য একটি বাসায় থাকত। ২০১৭ সালে ওই বাসার বারান্দায় ঝুলে থাকতে দেখা যায় ম্যাক্সকে। সে সময় ম্যাক্স নিচে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। এরিকা এই ছবি তুলে পার্সিয়ান ক্যাট গ্রুপে পোস্ট করেন। বিড়ালের মালিক এই পোস্ট দেখে খুব রেগে গেলেন। এরিকার সঙ্গে এ নিয়ে তর্কও হয়েছে মালিকের। পরে এরিকা সেই পোস্ট ডিলিট করতে বাধ্য হন।

এ ঘটনার প্রায় দুই মাস পর বিড়ালের ওই মালিক নিজেই এরিকাকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর বিড়ালকে দেখার কেউ নেই। এরিকা যেহেতু এ বিড়ালের ভালো চাইছিলেন তাই কয়েক দিনের জন্য নিজের কাছে নিয়ে রাখলে খুব ভালো হয়। এরিকা কয়েক দিনের জন্য বিড়ালটিকে রাখতে রাজি হন।

ওই মালিক ঝুড়িতে একটা প্লাস্টিকের বল আর ভাঙাচোরা মেলামাইনের খাওয়ার বাটিসহ বিড়ালটিকে এরিকার বাসায় দিয়ে যান। বিড়ালের খাওয়া বাবদ টাকাও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এরিকা জানিয়ে দেন, তাঁর অন্য বিড়াল বাটুল যা খাবে এ বিড়ালও তাই খাবে। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই থেকে ম্যাক্সের নতুন ঠিকানা হলো এরিকার বাসা। ওই মালিকই ম্যাক্স নামটি রেখেছিলেন।

ম্যাক্সের সঙ্গে এরিকা ও সনি সাহা

এরিকা বলেন, শুরুতে ম্যাক্স বাটুলকে একদম দেখতে পেত না, মারামারি করত। প্রশিক্ষণও ছিল না। ধীরে ধীরে আদর ও যত্নে বদলে যায় সে। একসময় বাটুল ও ম্যাক্সের মধ্যে ভাব হয়ে যায়।

এরিকা আরও বলেন, কয়েক দিনের জন্য ম্যাক্সকে রাখতে দিলেও পরে ওই মালিক নানা বাহানায় ম্যাক্সকে আর ফেরত নিচ্ছিলেন না। এক মাস পর একদিন ওই মালিক জানান, তাঁর বাসার কেউ ম্যাক্সকে রাখতে রাজি হচ্ছেন না, তাই ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাটুলের কথা ভেবে এরিকা ম্যাক্সকে রাখতে চাইছিলেন; কিন্তু এত দাম দিয়ে কেনার তখন সামর্থ্য তাঁর ছিল না। পরে ওই মালিক বিনা মূল্যে ম্যাক্সকে দিয়ে দেন। এরপর থেকে ম্যাক্স বাটুলের মতোই আদর পেতে থাকে। এভাবে দুই বছর কেটে যায়। এরিকা ফেসবুক, ইউটিউবে ম্যাক্স ও বাটুলকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট করেন, সেসব ভিডিও জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে।

ম্যাক্সের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত সমাধির সামনে এরিকা ও সনি সাহা

এরিকা ছোটবেলা থেকেই পশুপাখি ভালোবাসেন। বর্তমানে দুটি পথকুকুর ও একটি পাখিও পুষছেন।

এরিকা বলেন, ‘বাটুল আর ম্যাক্সকে নিজেদের ছেলের মতোই ভালোবেসেছি। ম্যাক্স মারা যাওয়ার পর স্বজন হারানোর মতোই কষ্ট পেয়েছি। এখনো সে বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভালোবেসে ম্যাক্সের সমাধি বানিয়েছি। এটা মেনে নিতে হয়তো অনেকের সমস্যা হচ্ছে।’