রাজধানী ঢাকার বাড়িভাড়া–সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে
রাজধানী ঢাকার বাড়িভাড়া–সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে

নির্দেশিকার নামে বাড়িভাড়া বাড়ানোর আয়োজন

রাজধানী ঢাকার বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়েছে, বার্ষিক হিসাবে ভাড়া বাবদ কোনো মালিক বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি আদায় করতে পারবেন না। অগ্রিম হিসেবে নেওয়া যাবে এক থেকে তিন মাসের ভাড়া।

নতুন নির্দেশিকা আজ মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। অবশ্য এই নির্দেশিকার ফলে বাড়িভাড়া আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার আইনে এক মাসের কথা বলা থাকলেও বাড়ির মালিকদের তিন মাস পর্যন্ত অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার শেওড়াপাড়ায় ১ হাজার ২৭৫ বর্গফুটের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন এক ব্যক্তি। সংবাদমাধ্যমে খবরটি পড়ার পর তিনি এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, তিনি যে ভবনে থাকেন, সেখানে ১ হাজার ২৭৫ বর্গফুট আকৃতির ফ্ল্যাট ৭০ লাখ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এই দরে ১৫ শতাংশ হিসাবে বাসাটির ভাড়া আসবে বছরে সাড়ে ১০ লাখ টাকা, মাসে সাড়ে ৮৭ হাজার টাকা। এখন তিনি ভাড়া দেন মাসে ১৮ হাজার টাকা।

# ৭০ লাখ টাকার ১,২৭৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ভাড়া নেওয়া যাবে মাসে ৮৭,৫০০ টাকা। # আইনে এক মাসের ভাড়া অগ্রিম নেওয়ার সুযোগ। উত্তর সিটির নির্দেশিকায় ১-৩ মাসের কথা বলা হয়েছে।

শেওড়াপাড়ার ওই ভাড়াটে বলেন, এই নির্দেশিকা কার্যত বাড়িভাড়া বাড়ানোর আয়োজন। এটা বাড়ির মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ করে দেবে। বাড়ির দামের ১৫ শতাংশ হারে ভাড়া নিলে সাত বছরের মধ্যেই মালিকের বাড়ি তৈরির খরচ উঠে যাবে। ভাড়াটেদের কোনো লাভ হবে না।

কী আছে নির্দেশিকায়

ঢাকা উত্তর সিটির নির্দেশিকায় ১৬টি বিষয়ে বলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. ভাড়াটে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করবেন। বাড়িওয়ালাদের অবশ্যই প্রমাণ কপি হিসেবে ভাড়াটেকে রসিদ দিতে হবে।

২. বাড়িতে ভাড়াটের যেকোনো সময়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে। বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই ভাড়াটেকে অবগত করবেন এবং বাস্তবায়নের আগে মতামত নেবেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ভাড়া বাড়ানোর সময় হবে জুন-জুলাই।

৪. দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর মানসম্মত ভাড়া দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সাপেক্ষে পরিবর্তন করা যাবে।

৫. নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়াটে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে মৌখিকভাবে সতর্ক করবেন এবং নিয়মিত ভাড়া প্রদানের জন্য তাগাদা দেবেন। তাতেও কাজ না হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে সমস্ত বকেয়া প্রদান করে দুই মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার জন্য লিখিত সতর্কতামূলক নোটিশ দেবেন। ভাড়াটের সঙ্গে আগে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করে উচ্ছেদ করতে পারবেন।

৬. আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে হলে দুই মাসের নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষ ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে পারবে।

৭. মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা ও ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।

৮. বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তিতে কী কী শর্তে ভাড়া দেওয়া হলো এবং করণীয় কী, সেসব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। চুক্তিপত্রে ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা ও কখন বাড়ি ছাড়বেন, তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।

৯. বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় ১-৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।

১০. সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটে সমিতি গঠন করতে হবে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে ভাড়ার বিবাদের সালিসে থাকবেন।

১১. যেকোনো সমস্যা ওয়ার্ড/জোনভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটে সমিতির আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। যদি সমাধান না হয়, পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানাতে হবে।

১২. সাম্প্রতিককালে ভবনে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ইত্যাদি নানা ধরনের মনুষ্য সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালা তাঁর প্রত্যেক ভাড়াটেকে ছাদের ও মূল গেটের (দরজা) চাবি শর্তসাপেক্ষে দেবেন।

সংবাদ সম্মেলনে উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ঢাকা মহানগরে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা ২০-২৫ লাখের বেশি নয়। ফলে শহরের একটি বড় অংশই ভাড়াটে। ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নজনিত জটিলতা ও অস্পষ্টতা থাকায় এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় বারবার অতিরিক্ত হারে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে।

সমস্যা কোথায়

বাড়িভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ ১৫ শতাংশ—নির্দেশিকার এই অংশটি পড়ার সময় উত্তর সিটির প্রশাসক বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ধরেই তাঁরা বিষয়টি নির্দেশিকায় রেখেছেন।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে ওই ১৫ শতাংশের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসক আরও বলেন, ‘একেকটি বাড়ির ফিটিংস এবং লোকেশন, কোনো বাড়ির বারান্দা ছোট-বড়, সেই অনুযায়ী বাসার ভ্যালুয়েশন (মূল্য) আছে। সেই ভ্যালুয়েশন ধরে, সেটার ১৫ পার্সেন্ট হিসাব করে সর্বোচ্চ ভাড়া নেওয়া যাবে।’

মোহাম্মদ এজাজ আরও বলেন, সরকারি আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই সেটাই তাঁরা নির্দেশিকায় রেখেছেন। তবে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে দর-কষাকষি করেই ভাড়া নির্ধারণ করেন।

বাড়িভাড়া আইন-১৯৯১-এর ১৫ নম্বর ধারায় নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব অংশে বলা আছে, নিয়ন্ত্রক, বাড়ির মালিক বা ভাড়াটের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো বাড়ির মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করবেন। এবং এমনভাবে তা নির্ধারণ করবেন যেন ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত ওই বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের সমান হয়।

সমস্যা হলো, দেশে বাড়িভাড়া আইন কখনো জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। আইনের বিধিমালাই হয়নি এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করেনি সরকার। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এ আইনের অধীনে প্রতিকার পেতে আদালতে যান। বাড়িভাড়া নির্ধারণে মূল্যের ১৫ শতাংশের ধারাটি নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও আইন কার্যকর করার দাবিতে ২০১০ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের ১ জুলাই রিটের রায় ঘোষণা করেন তৎকালীন বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুসের হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ছয় মাসের মধ্যে একটি ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিশন গঠন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গঠিত কমিশন যেসব সুপারিশ করবে, তা আইনি কাঠামোর রূপ না পাওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ করে ঢাকায় বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একজন করে নিয়ন্ত্রক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে বলেন হাইকোর্ট।

রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আজ প্রথম আলোকে বলেন, রায় ঘোষণা করা হলেও তা সইয়ের আগে বিচারপতি বজলুর রহমানের মৃত্যু হয়। পরে আরেক বেঞ্চে রিট শুনানির জন্য যায়। তিনি বলেন, ২০১৯ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৫ নম্বর ধারা (বাড়িভাড়া নির্ধারণসংক্রান্ত) চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সেটা আদালতে শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।

মনজিল মোরসেদ বলেন, বাড়ির মূল্যের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হারে ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ দিলে বিপর্যয় নেমে আসবে। ভাড়া অনেক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া আইনে এক মাসের বেশি অগ্রিম নেওয়ার সুযোগ নেই।