
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে জমে উঠল রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বৈশাখী মেলা। ব্যস্ত নগরজীবনে অবকাশের সুযোগে গ্রামীণ ঐতিহ্যের আবহে সাজানো এই মেলায় ঢুঁ মেরেছেন অনেকে। মাটির পুতুল, টেরাকোটার শোপিস, নকশিকাঁথা, বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, হাতপাখা, গ্রামীণ খেলনা—সব মিলিয়ে মেলার প্রতিটি কোণেই ছড়িয়ে আছে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া।
সাত দিনব্যাপী এই বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলা একাডেমি। পয়লা বৈশাখ মঙ্গলবার শুরু হয় এই মেলা।
আজ শুক্রবার বিকেলে বাংলা একাডেমির চত্বরে মেলায় দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে মানুষ ভিড় জমান এখানে। শিশুদের হাসি, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের আগ্রহে পুরো প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। শুধু কেনাকাটা নয়, অনেকেই আসেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের নতুন করে যুক্ত করতে।
মেলায় আসা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফাহমি কবির বলেন, মেলার পরিবেশ খুব সুন্দর, কিন্তু কিছু পণ্যের দাম আমার কাছে একটু বেশি মনে হয়েছে। তবু ঐতিহ্যের জন্য কিনছি।
ঘর সাজাতে পাটের তৈরি ফুলদানি, গয়নার বাক্স ও দেয়াল আয়না কেনেন ফাহমি। এ ছাড়া নিজের জন্য কেনেন হাতের তৈরি জামা।
বিভিন্ন অঞ্চলের কারুপণ্যের সমাহার
মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সমাহার নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের শাড়ি ও নকশিকাঁথার তৈরি পোশাকগুলো আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। সূক্ষ্ম কারুকাজ ও ঐতিহ্যবাহী নকশার কারণে এসব পোশাকের প্রতি আগ্রহ দেখা গেছে সব বয়সী ক্রেতার মধ্যে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক নিদর্শন (জিআই) পণ্যের উপস্থিতিও মেলাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি—এসব পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় স্টলে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ করা গেছে। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে এসব পণ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানছিলেন।
উত্তর বাড্ডা থেকে আসা নুসরাত জাহান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এখানে এত ধরনের দেশীয় পণ্য একসঙ্গে পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। প্রতিটি স্টলে নতুন কিছু দেখছি, খুব ভালো লাগছে।
মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের দেখাতে এনেছি। ওরা গ্রামের বৈশাখী মেলা কখনো দেখেনি। এখানে এসে গ্রামের আবহ পাওয়া যাচ্ছে। আমারও ছোটবেলার সেই গ্রামের মেলার কথা মনে পড়ছে।’
মেলায় অংশ নেওয়া বিক্রেতারাও বেশ আশাবাদী। সিরাজগঞ্জ থেকে এসে কুটিরশিল্পের পণ্যের স্টল দিয়েছেন আবদুল করিম। তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমির মতো জায়গায় স্টল দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এখানে মানুষের আগ্রহ বেশি, বিক্রিও ভালো হচ্ছে।’
মেলায় নিজের হাতে তৈরি নকশিকাঁথা ও হস্তশিল্প বিক্রি করছেন শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার পণ্যের বিশেষত্ব হলো সবকিছু হাতের কাজ। প্রতিটি নকশার পেছনে সময় ও পরিশ্রম আছে, তাই ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে দেখছেন।’
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, শুধু পণ্য কেনাবেচা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলাও। অনেকেই পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন, ছবি তুলছেন। আবার কেউ কেউ গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিচারণা করছেন। এই মেলায় তৈরি হয়েছে শহর আর গ্রামের মেলবন্ধন।
শুধু বিভিন্ন পণ্য নয়, শিশুদের জন্য মেলায় তৈরি করা হয়েছে অন্য রকম এক জগৎ। বর্ধমান হাউসের পাশে শিশুদের জন্য বসানো হয়েছে নাগরদোলা, দোলনা, মিনি ট্রেন—সবকিছুতেই তাদের দারুণ আগ্রহ। তবে শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও আনন্দে দোলনায় চড়ছেন, যা মেলার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দোলনায় চড়া শিশু আয়ান বলে, ‘আমি অনেক মজা পেয়েছি, আবার চড়তে চাই।’
মিনি ট্রেনে ঘোরা ছোট্ট তানহা বলে, ‘ট্রেনে চড়তে খুব ভালো লেগেছে, মনে হচ্ছিল আমি কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি।’
দেড় শতাধিক স্টল
আয়োজকেরা জানান, মেলায় মোট ১৬০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যের ৭টি, জামদানির ৬টি, নকশিকাঁথার ৪টি, বস্ত্রের ৪৪টি, শতরঞ্জির ৫টি এবং মণিপুরি শাড়ির ২টি স্টল রয়েছে। পাশাপাশি কারুশিল্পী জোন, শিশুদের রাইড ও বিনোদন জোন, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ১৩টি স্টল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রান্তিক কারুশিল্পীদের জন্য ১৩টি এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ২টি স্টল বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে।
মেলায় বাংলা একাডেমির প্রকাশিত বইও বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ে ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আর ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বইয়ে দেওয়া হচ্ছে ৫০ শতাংশ এবং ২০০১ সালের বইয়ে দেওয়া হচ্ছে ৭০ শতাংশ ছাড়।