আধুনিক ভবন, বড়সড় ফটক, পশু ওঠা–নামার পৃথক জায়গা—সবই আছে। ভবনের ভেতরে আছে কোটি টাকার যন্ত্র। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সবই অলস পড়ে আছে। জমেছে ধুলার আস্তর। তা–ও এক দিন বা দুই দিন নয়; বছরের পর বছর ধরে।
এমনটাই দেখা গেছে রাজধানীর হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের পশু জবাইখানায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে রয়েছে এ দুটি আধুনিক জবাইখানা।
ঢাকাবাসীকে নিরাপদ মাংস সরবরাহের জন্য এ দুটি পশু জবাইখানা নির্মাণ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল—জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশু বাদ দেওয়া, পশু জবাইয়ের পর সেই মাংস পরীক্ষা করে দেখা। এখানে পশুর রক্ত ও বর্জ্যের আধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসবের কিছু হয়নি।
ডিএসসিসি প্রকৌশল বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্টে হাজারীবাগের পশু জবাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগে ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটির তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন এটি উদ্বোধন করেন।
হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের জবাইখানা এখনো বাঁচানো সম্ভব। তবে কাগুজে কমিটি দিয়ে নয়। বাস্তবসম্মত ব্যবসা মডেল, আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহি ছাড়া এ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ডিএসসিসির ব্যর্থতার স্মারক হয়ে থাকবে।—আদিল মুহাম্মদ খান, নগর–পরিকল্পনাবিদ।
জানা গেছে, উদ্বোধনের দিন হাজারীবাগের পশু জবাইখানায় গরু জবাই করা হয়েছিল। এরপর সাত বছর পার হয়েছে। ওই জবাইখানায় আর কখনোই কোনো পশু জবাই হয়নি। অথচ এখানে ঘণ্টায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল জবাই করা যায়। জবাইখানাটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৮১ কোটি টাকা।
সরেজমিন দেখা যায়, হাজারীবাগের জবাইখানার পাঁচতলা ভবনের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। ভেতরে কিংবা বাইরে কোনো নিরাপত্তাকর্মীর দেখা পাওয়া যায়নি। সামনেই শামিয়ানা টাঙিয়ে বসেছে কোরবানির পশুর হাট।
ভবনটির ভেতরে থাকা আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক আছে কি না—এমন প্রশ্নে ডিএসসিসি যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, মাঝেমধ্যে এসব যন্ত্র চালিয়ে সচল রাখা হয়। তবে বছরের পর বছর এভাবে যন্ত্র ফেলে রাখা হলে যেকোনো সময় বিকল হতে পারে।
জবাইখানাটির সামনে কয়েকটি চায়ের দোকান। সেখানে ভিড় করে আছেন অনেকেই। এক দোকানি বললেন, ‘ভবনটি বছরের পর বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মানুষজন চা খেতে এসে জিজ্ঞেস করে—এটা কী? বলি, পশু জবাইখানা। তখন অনেকে অবাক হয়ে বলে, এখানে আবার কবে পশু জবাই হয়! আমরাও তো কোনো দিন দেখলাম না।’
কীভাবে আধুনিক পশু জবাইখানা চালু করা যায়, সেটা ভাবছি। যেভাবেই হোক এ দুটি জবাইখানা সচল করব।—আবদুস সালাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
অনেকটা একই চিত্র কাপ্তানবাজারের পশু জবাইখানার। এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। এই আধুনিক পশু জবাইখানায় ঘণ্টায় ১৪টি গরু আর ৩০টি ছাগল জবাই করার সক্ষমতা রয়েছে। এটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫২ কোটি টাকা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির সূত্রটি জানিয়েছে, সমীক্ষা ছাড়াই ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করে এ দুটি পশু জবাইখানা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথা থেকে পশু আসবে, কীভাবে আসবে, জবাইয়ের পর মাংস কীভাবে বাজারে যাবে—এসব নিয়ে ভাবনা ছাড়াই জবাইখানা দুটি নির্মাণ করা হয়। তাই উদ্বোধন হলেও বছরের পর বছর পশু জবাইখানা দুটি অচল পড়ে আছে।
অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকার পরেও কেন আধুনিক জবাইখানা দুটি চালু করা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্ন অনেকের। সূত্র জানায়, এর বড় কারণ ইজারা না হওয়া এবং পরিচালনায় সক্ষমতার ঘাটতি থাকা। কাজেই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এ দুটি জবাইখানা চালাতে চায় সিটি করপোরেশন।
নির্মাণের পরপর হাজারীবাগের পশু জবাইখানাটি তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ইজারামূল্য ধরা হয়েছিল ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি। পরে তা আরও কমিয়ে ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকার কিছু বেশি ধরা হয়। তা–ও কেউ দরপত্র জমা দেননি।
ইজারাদার না পাওয়ার কারণ স্পষ্ট। এখন ঢাকায় মাংস ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের সামনে, অলিগলিতে কিংবা বাজারের পাশেই নিজেদের মতো করে পশু জবাই করেন। এতে তাঁদের আলাদা পরিবহন খরচ লাগে না। জবাইখানার জন্য আলাদা ফি দিতে হয় না। সময়ও সাশ্রয় হয়। এমন বাস্তবতা না বদলালে কেউ কেন কোটি টাকা দিয়ে জবাইখানা পরিচালনার দায়িত্ব নেবে—এ উত্তর ডিএসসিসির কারও কাছে নেই।
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের জন্য মানসম্মত মাংস নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে ঢাকায় জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না বললেই চলে। তাই অসুস্থ পশু জবাই হলে সেটার মাংসের সঙ্গে নানা রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
সম্প্রতি পশু জবাইখানা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে ডিএসসিসি। সম্প্রতি হাজারীবাগ আধুনিক পশু জবাইখানা নতুন করে চালুর জন্য কমিটি গঠনে অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এ উদ্যোগের অধীনে কাপ্তানবাজার জবাইখানা চালুর কথাও আলোচনায় এসেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আগেও তো উদ্যোগ ছিল। দরপত্র হয়েছে, ইজারামূল্য কমানোর আলোচনা হয়েছে, যন্ত্র পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোঁজা হয়েছে। তবু জবাইখানা দুটি চালু করা যায়নি। তাই এবারও শুধু কমিটি করলে হবে না; কমিটির সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কীভাবে আধুনিক পশু জবাইখানা চালু করা যায়, সেটা ভাবছি। যেভাবেই হোক এ দুটি জবাইখানা সচল করব।’
বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা আধুনিক জবাইখানা দুটি সচল করতে এখন কী করা উচিত, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মতে, শুরুতেই জবাইখানা দুটি নিয়ে স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা করতে হবে। এর যন্ত্রপাতি সচল আছে কি না, মেরামত দরকার হলে কত টাকা লাগবে, কত জনবল লাগবে, মাসে পরিচালন ব্যয় কত—এসব না জেনে নতুন করে আর এক টাকাও খরচ করা ঠিক হবে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইজারামূল্যকে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। কেননা এটি এখন আর লাভের প্রকল্প নেই। প্রথম এক-দুই বছর কম ফি, ভর্তুকি বা সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করতে হতে পারে। ব্যবসায়ীরা ব্যবহার শুরু করলে পরে ফি পুনর্নির্ধারণ করা যাবে।
একসঙ্গে পুরো ঢাকা শহরের মাংস ব্যবসার ধরন বদলানোর চেষ্টা না করে নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজার নিয়ে পাইলট প্রকল্প শুরু করার মত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। হাজারীবাগের ক্ষেত্রে আশপাশের বাজার, কাপ্তানবাজারের ক্ষেত্রে পুরান ঢাকার নিকটবর্তী বাজারগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে জবাইখানার আওতায় আনা যেতে পারে। শুরুতে পরিবহন, সময়সূচি আর ফি সহজ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আইন প্রয়োগ করতে হবে ধাপে ধাপে। আগে সেবা সহজ করতে হবে। পরে দোকানের সামনে ও খোলা স্থানে পশু জবাই বন্ধে অভিযান চালাতে হবে। ফিটনেস সনদ ছাড়া মাংস বিক্রি বন্ধের ব্যবস্থা করা না গেলে আধুনিক জবাইখানায় ব্যবসায়ীরা যাবেন না।
সমীক্ষা ছাড়া কেন প্রকল্প নেওয়া হলো, ভবন শেষ হওয়ার আগে কেন যন্ত্রপাতি কেনা হলো, বাজারের বাস্তবতা না বুঝে কেনই–বা ইজারামূল্য ধরা হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া গেলে একই ভুল আবার হবে বলে মনে করেন নগর–পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের জবাইখানা এখনো বাঁচানো সম্ভব। তবে কাগুজে কমিটি দিয়ে নয়। বাস্তবসম্মত ব্যবসা মডেল, আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহি ছাড়া এ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার স্মারক হয়ে থাকবে।