ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যানজট। গাড়ির ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটি মোটরসাইকেল। হেলমেট পরা চালকের চোখ রাস্তায়, পেছনের আসনে নারী যাত্রীও বসে আছেন নিশ্চিন্তে। পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজনের চোখ আটকে গেল মোটরসাইকেলটির দিকে। কারণ, চালক ও যাত্রী—দুজনই নারী।
চালকের আসনে ছিলেন সাথী (ছদ্মনাম)। ছয় বছর বয়সী মেয়ের দেখাশোনা ও সংসারের কাজ সেরে সুযোগ পেলেই মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বের হন তিনি। পেছনের আসনে বসা অপরিচিত নারীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। অপরিচিত পুরুষের পেছনে বসে যাতায়াতে অস্বস্তি বোধ করেন—এমন নারীদের জন্যই তাঁর এ কাজ।
সাথী নারীদের রাইড শেয়ারিং উদ্যোগ ‘মায়া রাইড’-এর একজন চালক। এখানে নারী চালকদের বলা হয় ‘মায়াবী’। গত জুলাই থেকে ৩৮টি রাইড দিয়েছেন তিনি। কোনো দিন তিনটি রাইড দেন, আবার মেয়ের পরীক্ষা বা সংসারের ব্যস্ততায় কয়েক সপ্তাহ মোটরসাইকেল নিয়ে বেরই হতে পারেন না।
ফাহাদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস নারীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করার লক্ষ্য নিয়ে গত এপ্রিলে ‘মায়া’ উদ্যোগটি শুরু করেছেন। ‘উইমেন–ফার্স্ট রাইড সার্ভিস’ স্লোগানে যাত্রা করা এ উদ্যোগ প্রথমে মোটরসাইকেল দিয়ে শুরু হলেও এখন এতে প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিং সেবাও আছে। তবে উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় সমস্যা, নারী যাত্রীর চাহিদার তুলনায় চালক কম।
ঢাকার রাস্তায় চলাচলের সময় ফাহাদ-জান্নাতুল দম্পতি খেয়াল করেন, অনেক নারী রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। কিন্তু অপরিচিত পুরুষ চালকের পেছনে বসে দীর্ঘ পথ যেতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন।
তখন তাঁদের মনে প্রশ্ন আসে, চালকও যদি নারী হন?
প্রথমে ফেসবুকে পরীক্ষামূলক প্রচারণা চালান ফাহাদ। এতে নারী যাত্রী ও চালক—দুই পক্ষ থেকেই সাড়া আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় ‘মায়া রাইড’।
ফাহাদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস নারীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করার লক্ষ্য নিয়ে গত এপ্রিলে ‘মায়া’ উদ্যোগটি শুরু করেছেন। প্রথমে মোটরসাইকেল দিয়ে শুরু হলেও এখন এতে প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিং সেবাও আছে।
এখন মায়ায় নিয়মিত মোটরসাইকেল সেবা নেন ১০ জনের বেশি নারী। কেউ সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন বুকিং দেন। কেউ অফিসে যাওয়া-আসার জন্য সপ্তাহে ১০টি পর্যন্ত রাইড নেন।
সবচেয়ে বেশি চাহিদা গুলশান ও বনানীর অফিস এলাকায়। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও বসুন্ধরা থেকেও বুকিং আসে। সকালে অফিস শুরুর সময় চাপ বেশি থাকে।
ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে মায়ায় চালক হিসেবে যোগাযোগ করেছিলেন সাথী। সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় এক মাস সময় নেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামেন।
বাসে চলাচলের সময় নানা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। আবার প্রাইভেট কার বা অটোরিকশায় উঠলে শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতেন। নিজের চলাচলের জন্য তাই মোটরসাইকেলই বেছে নেন তিনি।
অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে রাইড শেয়ার করতে না চাইলেও অনেক নারীর বিকল্প থাকে না। সেই বিকল্পটা তৈরি করার তাগিদ থেকেই মায়ায় যোগ দিই।—সাথী, মায়া রাইডের চালক
সাথী বলেন, ‘অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে রাইড শেয়ার করতে না চাইলেও অনেক নারীর বিকল্প থাকে না। সেই বিকল্পটা তৈরি করার তাগিদ থেকেই মায়ায় যোগ দিই।’
প্রথম রাইডের দিন ভয়ও ছিল। তবে রাইড শেষে যাত্রী তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপু, অনেকক্ষণ ধরে কোনো রাইডার পাচ্ছিলাম না, আপনি আসায় খুব উপকার হলো।’ এই একটি বাক্যই ভয় দূর করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাথী।
এ কাজে স্বামীর পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন সাথী। তাঁর ভাষ্য, ‘একজন নারীর জন্য পরিবারের এই সমর্থন অনেক বড় শক্তি।’
আনিকা সালসাবিল মায়ার একজন নিয়মিত যাত্রী। দক্ষিণ বনশ্রী থেকে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে যাতায়াত করেন তিনি। আগে অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিতেন। ফেসবুকে মায়ার কথা জানার পর এই সেবা নেওয়া শুরু করেছেন।
আনিকা বলেন, নারী চালক থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বস্তি। পুরো পথ নিশ্চিন্তে থাকা যায়। অফিসে তাড়া থাকলে মোটরসাইকেলে দ্রুত পৌঁছানোও সম্ভব।
মায়ার হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি রাইডের অনুরোধ এসেছে। সম্পন্ন হয়েছে ৪০০টির বেশি। বর্তমানে দিনে গড়ে সাত থেকে আটটি রাইড হচ্ছে। চালকসংকটের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুরোধ পূরণ করা যায় না।
তবে চাহিদা অনুযায়ী সব সময় চালক পাওয়া যায় না। বুকিং দেওয়ার পরও কখনো চালক মেলে না। মায়ার নিজস্ব অ্যাপ না থাকায় ফেসবুক বা ফোনে আগে থেকে যোগাযোগ করতে হয় বলে জানিয়েছেন আনিকা।
মায়াবী বা নারী চালক হিসেবে রাস্তায় ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সাথীকে। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকলে কখনো অটোরিকশাচালকেরা অযাচিত উপদেশ দেন। কোনো কোনো বাস, প্রাইভেট কার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক খুব ঘেঁষে গাড়ি চালান। কেউ কেউ সাইড দিতেও চান না।
সাথী বলেন, ‘একজন পুরুষ রাইডারের সঙ্গে সাধারণত কেউ এমন আচরণ করতে সাহস পায় না।’
তবে সব অভিজ্ঞতা নেতিবাচক নয়। অনেক পথচারী ও চালক হাসিমুখে উৎসাহ দেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে চালু হয় মায়া রাইডের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ। এখনো অ্যাপ চালু হয়নি। যাত্রীরা তাই বর্তমানে ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ফোনকলের মাধ্যমে রাইড বুক করেন।
মায়ার হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি রাইডের অনুরোধ এসেছে। সম্পন্ন হয়েছে ৪০০টির বেশি। বর্তমানে দিনে গড়ে সাত থেকে আটটি রাইড হচ্ছে। চালকসংকটের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুরোধ পূরণ করা যায় না।
নারী চালক থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বস্তি। পুরো পথ নিশ্চিন্তে থাকা যায়। অফিসে তাড়া থাকলে মোটরসাইকেলে দ্রুত পৌঁছানোও সম্ভব।—আনিকা সালসাবিল, মায়া রাইডের যাত্রী
এখনো তাৎক্ষণিকভাবে মায়ার সেবা পাওয়া যায় না। যাত্রীদের এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে বুকিং রিকোয়েস্ট দিতে হয়। এরপর কাছাকাছি থাকা চালকের কাছে রাইডটি দেওয়া হয়। রাইডার নিশ্চিত হলে যাত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। দুই পক্ষকেই একে অপরের নম্বর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর যোগাযোগ করে রাইডার নির্ধারিত সময়ে যাত্রীর কাছে পৌঁছে যান।
মায়া বলছে, সমস্যা হয় যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর। অনেক চালককে খালি মোটরসাইকেল নিয়ে ফিরতে হয়। এ কারণে তাঁরা দূরের রাইড নিতে চান না। ফলে চাহিদা থাকলেও সব অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব হয় না।
ফাহাদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে মায়া রাইড চলছে ওয়েবসাইটনির্ভর ব্যবস্থায়। তবে অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। অ্যাপ তৈরি হয়ে গেলে সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে। রাইডার ও যাত্রী দুই পক্ষের জন্যই সেবাটা আরও সহজ হবে।
মায়ায় চালক বা মায়াবী হওয়ার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্যাক্স টোকেনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র লাগে।
উদ্যোগটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, চালক হিসেবে নিবন্ধনে আগ্রহী নারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক বাইক ব্যবহার করেন। তাঁদের অনেকের বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র নেই।
এ কারণে ২০ থেকে ৩০ জন আগ্রহী নারীকে এখনো চালক হিসেবে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আবার পারিবারিক কারণেও অনেকে নিয়মিত রাইড দিতে পারেন না। সন্তান বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে কেউ কেউ টানা ১০ থেকে ১৫ দিন বিরতিতে থাকেন।
মায়া রাইড এখন আর মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিং সেবাতেই সীমাবদ্ধ নেই; স্কুলগামী শিশুদের জন্যও তারা চালু করেছে ‘মায়া কিডস’ ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম।
অনেকের পক্ষে প্রতিদিন সন্তানকে নিজে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া বা ছুটির পর নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। আবার অন্য কারও মাধ্যমে সন্তানকে পাঠাতেও ভরসা পান না অনেকে। এ ভাবনা থেকেই মায়া রাইডের নতুন উদ্যোগ ‘মায়া কিডস’।
এ ব্যবস্থাও প্রিবুকিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। মাসিক প্যাকেজের আওতায় এ ব্যবস্থায় বাসা থেকে শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল শেষে নিরাপদে বাসায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে পরিবারের একজন সদস্যও শিশুর সঙ্গে যেতে পারেন। ফলে সন্তান কার সঙ্গে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ও পরিবারের নজরে থাকে।
ফাহাদ চৌধুরী বলেন, মায়ার চালক ও যাত্রীদের জন্য এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিমা নেই। যাত্রীদের পরিচয় ফেসবুক প্রোফাইল ও ফোনকলের মাধ্যমে যাচাই করা হয়।
বৃষ্টি বা খারাপ আবহাওয়ায় চালক চাইলে আগাম বুক করা রাইড বাতিল করা যায়। এ ছাড়া কোনো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও রাইড প্রত্যাখ্যানের সুযোগ আছে বলে জানিয়েছেন ফাহাদ।
ফাহাদ বলেন, রাত নয়টা পর্যন্ত মায়ার সেবা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেলের প্রতি রাইডে ১০ শতাংশ এবং প্রাইভেট কারে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। কার-শেয়ারিং সেবায় চারটি গাড়িতে প্রায় ১৫ জন চাকরিজীবী নারী মাসিক চুক্তিতে যাতায়াত করছেন।
মায়ার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বসুন্ধরা, বারিধারা ও পুরান ঢাকায় এই সেবা চালু আছে। চালকের সংখ্যা বাড়লে অন্যান্য এলাকায়ও সেবা দেওয়া হবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আগামী এক বছরে আরও অনেক দক্ষ, পেশাদার ও ভেরিফায়েড নারী চালককে রাজপথে দেখতে চাই। নারীদের স্বস্তিতে চলাচলের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের আয়ের পথ তৈরি করাই মায়ার লক্ষ্য। ঢাকার রাস্তায় সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছে মায়া।’