রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্কে চার বছরের পথশিশু পারভিন
রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্কে চার বছরের পথশিশু পারভিন

পাঠানো হয়েছে ভিক্ষা করতে, অথচ চার বছরের শিশুটির স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া

পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের এক কোণে পড়ে থাকা ময়লা–আবর্জনা আর কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে খেলছিল পারভিন। বয়স মাত্র চার বছর। এই বয়সে একটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা থাকলেও তার দিন কাটে পার্কের কোণে কিংবা ফুটপাতে। কথায় কথায় পারভিনের কাছে তার মা–বাবার কথা জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বলা হয়, ‘চলো, তোমার বাবার কাছে যাই।’ কথাটি শুনতেই বদলে যায় শিশুটির মুখ। ভয় পেয়ে সে বলে, ‘আব্বার কাছে যামু না, গেলেই মারব।’

কেন বাবা মারবে, জানতে চাইলে পুরোনো কলম নিয়ে খেলতে খেলতে পারভিন জানায়, বাবা তাকে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতে পাঠিয়েছে। কিন্তু সে টাকা না তুলে লুকিয়ে পার্কে খেলছে। শিশুটির ভাষায়, ‘আব্বা আমারে টাকা তুলতে বলছে, আমি না গিয়া লুকাইয়া লুকাইয়া এখানে খেলতাছি।’

পারভিনের বাবা তখন পার্কের ভেতরে ঘুমাচ্ছিলেন। আর মা রায়সাহেব বাজারে কলম বিক্রি করছিলেন। সঙ্গে ছিল পারভিনের আরও তিন বোন।

এদিকে পারভিনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার বাবা মুন্না ঘুম থেকে উঠে পড়েন। কথার এক ফাঁকে জানা যায় সকাল থেকে পেটে খাবার পড়েনি পারভিনের। ক্ষুধার কথা শুনে তার বাবার অনুমতি নিয়ে তাকে রুটি কিনে দেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু সেই রুটিও বেশিক্ষণ তার কাছে থাকেনি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, মেয়ের হাত থেকে রুটি নিয়ে খাচ্ছেন বাবা। তবে এতে শিশুটি মন খারাপ করেনি; বরং মুখে হাসি লেগেছিল।

ছোট্ট পারভিন জানায়, প্রতিদিন ভাত খাওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতে হয় তাকে। বিকেলে বাবা সেই টাকার হিসাব নেন। টাকা তুলতে না পারলে শুধু পারভিন নয়, তার অন্য বোনদেরও মারধর করা হয়।

পার্কের এক কোণে খেলছে পারভিন। কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, কৌটা আর ফেলে দেওয়া জিনিসপত্রই এই চার বছর বয়সী শিশুর খেলার সামগ্রী

পারভিনের অন্য তিন বোন ফাতেমা, রোজা ও পান্না। দুজন পারভীনের চেয়েও ছোট। তাদের মা মোসাম্মৎ নুপুর চার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রায়সাহেব বাজার ও সদরঘাটের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কলম বিক্রি করেন। পাশাপাশি মেয়েদের খাবারের জন্য টাকা চেয়ে মানুষের কাছে হাত পাতেন। হাত পাতে শিশুরাও। দিন শেষে সেই টাকা তুলে দিতে হয় মুন্নার হাতে। পার্কের পাশে থাকা এক চা–দোকানির অভিযোগ, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে পাওয়া টাকার একটি অংশ পারভিনের বাবা মাদক সেবনে ব্যয় করেন।

অভাবের পাশাপাশি পারভিন ভুগছে স্বাস্থ্য সমস্যায়। বেশ কিছুদিন ধরে তার মাথা ও ঘাড়ে ফোড়া হয়েছে। মুখের ভেতরেও ঘা। পারভিনের আক্ষেপ, ‘অনেক দিন ধইরা বাপকে বলতেছি, আমার ঘাড়ে ও মাথায় ফোড়া হইছে। আমাকে ওষুধ কিনে দিতে। দিমু দিমু কইরা আর কিন্না দেয় না।’

সন্ধ্যায় কথা হয় পারভিনের মা মোসাম্মৎ নুপুরের সঙ্গেও। স্বামীর আচরণ সম্পর্কে পারভিনের মায়ের অভিযোগও একই রকম। তিনি বলেন, মেয়েরা টাকা রোজগার করতে না পারলে স্বামী বকাবকি করেন। এ নিয়ে তাঁকেও মারধর করা হয়। তিনি চান, তাঁর স্বামী আবার কাজ শুরু করুক, সংসারের দায়িত্ব নিক।

বাহাদুর শাহ পার্কের সিঁড়িতে চার বোন—ফাতেমা, রোজা, পারভিন ও পান্না। মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই না থাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক আর ফুটপাতেই কাটছে তাদের শৈশব

তবু স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার

এত অভাবের মধ্যেও পারভিনের একটি স্বপ্ন আছে। লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হওয়ার ইচ্ছা তার। সে বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে অনেক বড় হতে চাই। বড় হয়ে স্যার হতে চাই। সবাইরে পড়াইতে চাই।’

পারভিনের মা জানান, চার মেয়েকে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার–উকিল বানাতে চাই। প্রয়োজনে মানুষের বাসায় কাজ করে হলেও তাদের পড়াতে চাই। এভাবে রাস্তায় রাস্তায় থাকতে আর ভালো লাগে না। অল্প কিছু টাকা জমাইতে পারলে তাদের নিয়া বাড়ি ফিরা যামু। নাহয় কেউ আর্থিক সহায়তা করলে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারতাম।’

পরিবারটি জানায়, তারা প্রায় চার বছর ধরে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় বসবাস করছে। তাদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর। পারভিনের বাবা মুন্না আগে রিকশা চালাতেন। তাঁর দাবি, রিকশা চুরি হয়ে যাওয়ার পর তিনি কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘কেউ কাজ দিলে করতে চাই। বাধ্য হয়ে বউ–বাচ্চাদের দিয়ে কাজ করাচ্ছি। আমিও চাই আমার মেয়েরা লেখাপড়া করুক।’