রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফের এক জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপকের গাড়ি প্রবেশ করছে ভবনে। ৩০ মার্চ, ঢাকা
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফের এক জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপকের গাড়ি প্রবেশ করছে ভবনে। ৩০ মার্চ, ঢাকা

জ্বালানি সাশ্রয়ে পিকেএসএফের নির্দেশনা কর্মকর্তারা মানছেন কি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তৈরি করেছে সংকট, সে কারণে জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা উদ্যোগ চলছে। সে উদ্যোগে যুক্ত হয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনও (পিকেএসএফ) জ্বালানির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করেছে।

সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতায় সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় পিকেএসএফ জ্বালানির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পিকেএসএফের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তার জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।

পিকেএসএফ আরও বলেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং যথাসম্ভব বিদ্যুৎসাশ্রয়ী উপায়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এসবের অংশ হিসেবে পিকেএসএফের সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দাপ্তরিক কাজে অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবেন। অফিস ভবনে সীমিত মাত্রায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পিকেএসএফ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের এ পদক্ষেপের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল।

গত রোববার সেই নির্দেশনা দেওয়ার পর সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও পিকেএসএফ ভবনে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বেশির ভাগ কর্মকর্তা অফিসের গাড়িই ব্যবহার করছেন।

পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের অবশ্য দাবি করছেন, বেশির ভাগ কর্মকর্তাই নির্দেশনা মানছেন। সবাই যাতে নির্দেশনা মানেন, সে জন্য ধীরে ধীরে আরও কঠোর হবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

‘বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিগগিরই ৫০% জ্বালানি সাশ্রয় পুরোপুরি কার্যকর হবে। ধীরে ধীরে আমরা এ বিষয়ে আরও কঠোর হব।’
ফজলুল কাদের, এমডি, পিকেএসএফ

কেন এ উদ্যোগ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোয় তেল-গ্যাসের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানির বাজার এখন অস্থির। বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলোয়। চাহিদামতো তেল না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোববার জ্বালানি সাশ্রয়ের ঘোষণা দেয় পিকেএসএফ কর্তৃপক্ষ।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফের ভবনে ঢুকছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি মাইক্রোবাস। ৩০ মার্চ, ঢাকা

সরেজমিনে যা দেখা গেল

সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিনই সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফ ভবনে থেকে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবাসগুলো কর্মকর্তাদের নিয়ে আসছে। অফিসের গাড়িতে চড়ে অফিসে আসেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যন, এমডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।

একাধিক গাড়িচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কর্মকর্তাদের বহন করা পিকেএসএফের মাইক্রোবাসের সংখ্যা আট। এ ছাড়া উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তার যানবাহন–সুবিধা দেয় পিকেএসএফ।

যেসব কর্মকর্তার অফিসের গাড়ি রয়েছে, তাঁদের অনেকে আসেন সেই গাড়িতে চড়ে। কয়েকজন কর্মকর্তাকে ভবনের কাছাকাছি দূরত্বে নেমে হেঁটে অফিসে ঢুকতে দেখা যায়। কিছু কর্মকর্তা অটোরিকশায় কিংবা হেঁটেও অফিসে আসেন।

মঙ্গলবার এক ব্যক্তিগত গাড়িচালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি পিকেএসএফের গাড়ি চালালেও তাঁর নিয়োগ চুক্তি হয় পিকেএসএফের কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এদিনও তিনি ওই কর্মকর্তার বাসায় গিয়ে তাঁকে গাড়িতে করে নিয়ে এসেছেন। এই গাড়িচালক তাঁর নিয়োগকর্তাকে অফিসে আনা-নেওয়ার পর গাড়ি পিকেএসএফ ভবনেই রাখেন।

জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনার বিষয়ে এই গাড়িচালক বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। নিয়োগকর্তাও কিছু বলেননি।

দুদিনই প্রতিষ্ঠানটির একাধিক জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপককেও অফিসের গাড়িতে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

কয়েকজন গাড়িচালক জানান, নির্দেশনা দেওয়ার পর কিছু গাড়ির চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে অনেকে এখনো যাতায়াতের জন্য গাড়ি ব্যবহার করছেন। ঢাকার বাইরে দাপ্তরিক কাজে যাতায়াতের জন্য পিকেএসএফের পরিবহন ব্যবহার বন্ধ রয়েছে।

জ্বালানি সাশ্রয়ের ঘোষণা দিলে মাইক্রোবাস চালানোর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, এসব মাইক্রোবাসকে তাঁরা গণপরিবহন হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ, প্রতিটি গাড়িতে ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তা যাতায়াত করেন। তাই এগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

সবার আগে মন্ত্রীদের জ্বালানি সাশ্রয় করতে হবে। তাঁদের দেখে সচিবেরা বাধ্যতামূলক জ্বালানি সাশ্রয় করবেন। একে একে সব প্রতিষ্ঠান জ্বালানিসাশ্রয়ী হবে।
শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক কাজে গাড়ি ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

‘আমরা অফিসের গাড়িতে এলেও পরে দাপ্তরিক কাজে গণপরিবহন ব্যবহার করছি। এ নির্দেশনা সবাই মানছেন।’

যেসব কর্মকর্তা এখনো গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁদের সম্পর্কে ফজলুল কাদের বলেন, ‘আমরা ৫০% জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সব কর্মকর্তার জন্য সে অনুযায়ী হিসাব রাখা হচ্ছে। বেশির ভাগ কর্মকর্তা নির্দেশনা মানছেন।’

‘বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিগগিরই ৫০% জ্বালানি সাশ্রয় পুরোপুরি কার্যকর হবে। ধীরে ধীরে আমরা এ বিষয়ে আরও কঠোর হব,’ যোগ করেন ফজলুল কাদের।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফের ভবনে ঢুকছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি মাইক্রোবাস। ৩০ মার্চ, ঢাকা

‘প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ’

শুধু একটি দপ্তর নয়, জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকুরেদের সুযোগ-সুবিধা এবং তাঁদের পেছনে ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সামগ্রিক উদ্যোগ না নিলে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ সফল হবে না। কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগকে ‘উৎসবে’ পরিণত করার পরামর্শ দিয়ে এম শামসুল আলম বলেন, ‘সবার আগে মন্ত্রীদের জ্বালানি সাশ্রয় করতে হবে। তাঁদের দেখে সচিবেরা বাধ্যতামূলক জ্বালানি সাশ্রয় করবেন। একে একে সব প্রতিষ্ঠান জ্বালানিসাশ্রয়ী হবে।’ সরকারি সব অফিসে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘অপার সুযোগ-সুবিধা’ নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেন তিনি।

‘তাঁদের ভোগবিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকার বিপদে পড়বে।’