ওয়াসার সায়েদাবাদ প্রকল্প

৮ বছরেও অগ্রগতি নেই, ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা

ঢাকা ওয়াসা
ফাইল ছবি

প্রকল্পের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরুই হয়নি। আরও পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও প্রকল্পের অগ্রগতি ৫ শতাংশেরও কম। কাজের অগ্রগতি না থাকলেও প্রকল্পের খরচ বেড়ে গেছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এই চিত্র ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের (ফেজ-৩)।

রাজধানীতে ভূ-উপরিভাগের পানি সরবরাহ বাড়াতে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পটি (ফেজ-৩) নেওয়া হয়। এর মেয়াদ ছিল ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্প ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। তাতে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের পানির উৎস মেঘনা নদীর দূষণ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার টানাপোড়েনসহ একাধিক কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ নেয় ঢাকা ওয়াসা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। নতুন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। সংশোধিত মেয়াদেরও আড়াই বছরের কম সময় বাকি। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

রাজধানীতে পানি সরবরাহ বাড়াতে ১৯৯৮ সালে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার নির্মাণ শুরু হয়। এটি চালু হয় ২০০২ সালের জুলাই মাসে। পরিকল্পনা ছিল দুই বছরের মধ্যেই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় চালুর। কিন্তু ড্যানিশ কোম্পানি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের দ্বিতীয় পর্যায় চালু হয় সাড়ে ১০ বছর পর, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। এই দুই পর্যায়ের পানির উৎস শীতলক্ষ্যা নদী।

সায়েদাবাদ তৃতীয় পর্যায়ের পানির উৎস মেঘনা নদী। এই প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসা নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার হাড়িয়া এলাকার মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করবে। ওয়াসা বলছে, ঢাকা শহরের চার পাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগে পানির দূষণ মাত্রা বেশি। তাই মেঘনা নদী থেকে পানি নিয়ে আসার প্রকল্প নেওয়া হয়। দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি লিটার অপরিশোধিত পানি সায়েদাবাদের শোধনাগারে সরবরাহ করার কথা। সেই পানি পরিশোধন করে বিদ্যমান সরবরাহের অতিরিক্ত দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি লিটার পানি ঢাকা মহানগরীতে সরবরাহ করা প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ফ্রেঞ্চ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি), জার্মানির কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, দ্য ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও ডানিডা। প্রকল্পের অর্থায়নকারী দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ২০১৭ সালে সায়েদাবাদ তৃতীয় পর্যায়ের পানি সংগ্রহের উৎসস্থল পরিদর্শন করে দূষণ দেখতে পান। মেঘনা নদীদূষণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো চিঠি দেয়। দাতাগোষ্ঠীর চাপে মেঘনার দখল-দূষণ রোধ করতে ঢাকা ওয়াসা একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে। মেঘনা নদী নিয়ে দাতাগোষ্ঠীর সমস্যা কেটে গেছে বলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার বক্তব্য জানতে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় ১৫ মার্চ। সংস্থাটির উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা এ এম মোস্তফা তারেক ২৩ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, সায়েদাবাদ (ফেজ-৩) প্রকল্পে একাধিক দাতাগোষ্ঠী অর্থায়ন করছে। এসব গোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু শর্ত থাকে, সেগুলো পূরণ করতে অনেকটা সময় চলে গেছে। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণেও বিলম্ব হয়েছে।

দাতাগোষ্ঠীদের সঙ্গে অর্থায়নবিষয়ক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে এ এম মোস্তফা তারেক বলেন, প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত হবে। নির্ধারিত সময়ে হয়তো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। তবে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ করা হবে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ শাখা থেকে ঢাকা ওয়াসাকে চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, সায়েদাবাদ তৃতীয় পর্যায়ে ঋণসহায়তার জন্য ডেনমার্ক সরকারের সঙ্গে ২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সরকারের সমঝোতা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতে ওয়াসাকে প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

ঢাকা ওয়াসা ২০০৯ সাল থেকে মাটির নিচের পানির ব্যবহার কমিয়ে নদীর পানি শোধনের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর কথা বলে আসছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান ২০২৩ সালের মধ্যে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎপাদন অন্তত ৭০ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখনো ওয়াসার সরবরাহ করা পানির প্রায় ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎসের (মাটির নিচের)।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান গত বছরের ৫ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘নগরবাসীর চাহিদা—ঢাকা ওয়াসার সক্ষমতা’ শীর্ষক সংলাপে বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে ৭০ ভাগ ভূ-উপরিভাগের উৎস থেকে পানি উৎপাদন করা হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নির্ভর করছে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের (গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প) ওপর। এই দুটি প্রকল্পেরই মেয়াদ ও খরচ বাড়লেও অগ্রগতি কম। দুটি প্রকল্পের কোনোটিই ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হবে না।

এই বিষয়ে নগর গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে ভূ-উপরিভাগের পানির ব্যবহার ৭০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে না। ভূগর্ভস্থ পানির অতি ব্যবহারের পরিণতি ভয়ানক হতে পারে। ওয়াসার প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির চিত্র নিয়মিত। বাস্তবতাবিবর্জিত, উচ্চাভিলাষী সব প্রকল্প নেওয়াতেই এই অবস্থা, যার দায় টানতে হচ্ছে ওয়াসার গ্রাহকদের।