রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)। ২২ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)। ২২ আগস্ট ২০২৬

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সব তথ্য উন্মুক্ত করার দাবি বিশেষজ্ঞদের

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনসহ প্রকল্পসংক্রান্ত সব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, বিপুল ব্যয়ের এই ‘সুপার মেগা’ প্রকল্প নিয়ে জনগণকে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতার সাম্প্রতিক দাবির সঙ্গে এমন গোপনীয়তা সাংঘর্ষিক। প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি সংসদের পানিসম্পদবিষয়ক কমিটিতে প্রকাশ্য গণশুনানির আয়োজনেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি উঠে আসে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

চলতি বছরের মে মাসে সরকার পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০৩৩ সালের জুনে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

সরকারের ভাষ্য, পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির পানিসংকট সমাধানে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এর ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং কৃষি ও মাছের উৎপাদন বাড়বে।

প্রকল্প নিয়ে ১০ প্রশ্ন

মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বাপার সহসভাপতি নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর প্রবন্ধে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে ১০টি প্রশ্ন তোলেন।

প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে ৬৯৮ কিউমেক পানি সরবরাহ করবে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার মাত্র ৩০ শতাংশ আসবে সঞ্চিত পানি থেকে। বাকি ৭০ শতাংশ পানি আসতে হবে গঙ্গার চলতি প্রবাহ থেকে। অর্থাৎ পাংশার ভাটি এলাকা থেকে পানি সরিয়ে এনে এই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এতে পাংশার উজান ও ভাটির মধ্যে পানির প্রবাহ প্রায় ৬০:৪০ অনুপাতে ভাগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান সংকট পানির স্বল্পতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। এর জন্য মূলত পোল্ডার (নদী বা সমুদ্রের অগভীর অংশে বাঁধ দিয়ে ঘেরা নিচু জমি) ও বেড়িবাঁধ দায়ী। অথচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতা সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান নেই। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, সেটিকেও প্রবন্ধে ‘রঙিন ভবিষ্যৎ চিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রবন্ধে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, চুক্তিটির মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। এর নবায়নের আগে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে অগ্রসর হলে আন্তর্জাতিক পানিবণ্টন আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের চাপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকা অবস্থায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্প নেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও তোলা হয়।

তথ্য না থাকায় বিতর্ক

তবে নজরুল ইসলামের প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যকে ‘একপেশে’ বলে মন্তব্য করেন পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মালিক এ ফিদা খান। তাঁর মতে, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে না আসার কারণেই এ ধরনের একপেশে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি প্রকল্পের সম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রকাশের দাবি জানান।

সভায় বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানানো হলেও তাঁরা সেগুলো পাননি। এমনকি তথ্য অধিকার আইনেও আবেদন করে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প নিয়ে এত লুকোচুরি কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন মালিক এ ফিদা খান।

পলি ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ

মতবিনিময় সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মত তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর প্রকল্পে পলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, গঙ্গা-পদ্মা অত্যন্ত পলিবাহী নদী। এ নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে বিপুল পরিমাণ পলি আটকে যেতে পারে। সেই পলি অপসারণ করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে।

তবে সমালোচনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, এ উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবে না। বরং পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয়ে যে সমালোচনা উঠেছে, সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাত কোটি মানুষ সুফল পেতে পারেন।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে এক লাখের বেশি ব্যারাজ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে। কারণ, কৃষির জন্য শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। পদ্মায় ব্যারাজ নিয়ে পরিবেশবিদদের আপত্তি থাকলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনায় নিতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যারাজের বিকল্প কী হতে পারে, সেটিও ভাবা প্রয়োজন।

মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি খুশি কবীর, ভূতত্ত্ববিদ আহাদ চৌধুরী, রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন প্রমুখ। সভায় আরও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী মো. খালেকুজ্জামান।