
দেশের নাগরিক হিসেবে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। সমতলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনপদে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর বিচার হয়নি।
আজ বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। তাঁরা সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন, মন্ত্রণালয় গঠনসহ পাঁচ দফা দাবি করেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ তাদের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রবীন্দ্র সরেন বলেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের সব আন্দোলন–সংগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাদের জমিজমা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নারীদের সম্ভ্রমহানি করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রান্তিক মানুষেরা কোনো ন্যায্য বিচার পাচ্ছে না।
রবীন্দ্র সরেন আরও বলেন, এ দেশের মানুষ হিসেবে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। দেশের ৫০টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, সম্পদ ও সম্ভ্রমের অধিকার রক্ষার আন্দোলন করে আসছে। নওগাঁর আলফ্রেড সরেন, দিনাজপুরের টুডু সরেন, সাতক্ষীরার নরেন্দ্রনাথ মুন্ডার হত্যার বিচার এখনো হয়নি। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে পুলিশের গুলিতে নিহত ৩ সাঁওতাল হত্যার বিচার হয়নি। সেই হামলায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া ৩২ জন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অথচ তাঁরা জমির অধিকার পাননি।
দিনাজপুরে স্বপ্নপুরী পার্কের নামে ক্ষমতাশালীরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বিপুল জমি দখল করে নিয়েছে। বগুড়ায় তাদের উচ্ছেদ করে জমি-ঘরবাড়ি দখল করে নিয়েছে সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা প্রভাবশালীরা। এসব কারণে তারা পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি করেছেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পাঁচ দফার মধ্যে অপর তিনটি দাবি হলো গাইবান্ধার ঘটনায় নিহত তিন সাঁওতালসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করা। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ভূমি দখল, মিথ্যা মামলা, পুলিশি হয়রানি ও ভূমি অফিসের দুর্নীতি বন্ধ করা। পার্বত্য চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। আদিবাসী পরিষদ তাদের তিন দশক পূর্তি ও পাঁচ দফা দাবি আদায়ের জন্য আগামী ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগে ‘আদিবাসী সমাবেশ’–এর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান বলেন, তাঁদের আন্দোলন দুর্বল করতে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য প্রভাশালীদের মদদে পকেট কমিটি করা হচ্ছে। এসব কমিটির সঙ্গে তিন দশক ধরে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করা জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি এদের বিরুদ্ধে সচেতন থেকে নিজেদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান করার আহ্বান জানান।
পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সুভাষচন্দ্র হেমব্রম সভাপতির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এবং এটি সঞ্চালনা করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এসব প্রান্তিক মানুষকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলা হচ্ছে। তাদের ক্ষুদ্র বলে চিহ্নিত করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের দাম্ভিকতা প্রকাশ করে তাদের হেয়প্রতিপন্ন করছে। মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু ধর্মনিরপেক্ষ নয়, জাতিনিরপেক্ষ, ভাষানিরপেক্ষ ও লিঙ্গনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক লজ্জার বিষয়। পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকায় তারা কিছুটা হলেও তাদের অধিকার আদায় করতে পেরেছে। কিন্তু সমতলের বাসিন্দারা খুবই নির্যাতিত ও বঞ্চিত। কোনো বিভ্রান্তির কবলে না পড়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করার পরামর্শ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন গণ আজাদী লীগের সভাপতি এস কে আজাদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বগুড়া জেলার সভাপতি সন্তোষ সিং ও নাটোর জেলার সভাপতি রঘু নাথ এক্কা।