
রাজধানী ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে চুয়াডাঙ্গা যেতে নদীয়া ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসে দুজনের জন্য টিকিট কাটেন আজিজুল হক ও মনোয়ারা বেগম দম্পতি। বাসভাড়া বাবদ তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হয় মোট ১ হাজার ৭০০ টাকা। তবে তাঁদের জন্য যে টিকিট দেওয়া হয়েছে, সেখানে ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ওই টাকা থেকে আরও ২০০ টাকা কম। অর্থাৎ ১ হাজার ৫০০ টাকা।
আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কথা হয় আজিজুল-মনোয়ারা দম্পতির সঙ্গে। স্বামী আজিজুল হক বলেন, ‘টিকিট নেওয়ার সময় ভালো করে খেয়াল করিনি ভাড়া কত লেখা। এটা তো রীতিমতো আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হলো। আমাদের কাছে নিল একরকম টাকা আর টিকিটে লিখল আরেক রকম।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএর) হিসাবে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে চুয়াডাঙ্গার দূরত্ব ২১৬ কিলোমিটার। এই দূরত্বের নির্ধারিত ভাড়া ৬৩৮ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এই গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের কাছে ভাড়া নেওয়া হয় ৫০০-৫৫০ টাকা। আর ঈদের সময় নেওয়া হচ্ছে ৮৫০ টাকা, যা বিআরটিএর নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ টাকার বেশি।
এ বিষয়ে নদীয়া ডিলাক্স পরিবহনের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিকিট বিক্রেতাদের একজন বলেন, যাত্রীদের কাছে অনুমতি নিয়েই ঈদ বকশিশ হিসেবে ৫০-১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরা খুশি হয়েই এই টাকা দিচ্ছেন। তাঁদের বাস মুজিবনগর পর্যন্ত যায়, এই গন্তব্যে বিআরটিএর নির্ধারিত ভাড়া ৭৫৫ টাকা। তাঁরা আরও ৫ টাকা কম নিচ্ছেন বলেও জানান নদীয়া ডিলাক্স পরিবহনের ওই টিকিট বিক্রেতা।
গাবতলী বাস টার্মিনালের বাসের জন্য অপেক্ষমাণ একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রীদের কাছে ১০০-২০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত টাকা না দিলে টিকিট বিক্রি করছে না। টিকিট বিক্রেতারা বলছেন, এখন না গেলে বিকেলের পর টিকিটের দাম আরও বাড়বে।
এ ছাড়া যাত্রীরা যে গন্তব্যেই যাক, ভাড়া নেওয়া হচ্ছে শেষ গন্তব্যের। অর্থাৎ যে বাস গাবতলী থেকে পাটুরিয়া, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা হয়ে মেহেরপুর পর্যন্ত যায়, ওই বাসে যাত্রী মেহেরপুরের আগে যেকোনো গন্তব্যে নামলেও তাঁকে ভাড়া দিতে হচ্ছে মেহেরপুর পর্যন্ত। মেহেরপুর পর্যন্ত যাত্রীদের কাছে নেওয়া হচ্ছে ৭০০ টাকা।
মাগুরার যাত্রী সালাম খান বলেন, স্বাভাবিক সময়ে মাগুরা পর্যন্ত বাস ভাড়া লাগে ৪০০-৪৫০ টাকা। এখন মাগুরা যেতেও ৭০০ টাকায় টিকিট কাটতে হচ্ছে। তিনি সুমন ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসের টিকিট কাটেন।
আজ মঙ্গলবার সকালে গাবতলীতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদে ঘরমুখী যাত্রীর চাপ গত কয়েক দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি। যাত্রীরা এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে টিকিটের জন্য যাচ্ছেন। কোনো পরিবহনের বাসে আসন পছন্দ হচ্ছে না, কোনো বাসের ভাড়া আবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে।
কেউ কেউ আবার গন্তব্যের টিকিট কেটে নির্ধারিত সময়ে বাসে ওঠার জন্য টার্মিনালে অপেক্ষা করছেন। এর মধ্যে অনেকে সকাল সাত-আটটার মধ্যেই টার্মিনালে পৌঁছে গিয়েছিলেন বলেও জানান।
আমিনবাজার সেতুর ঢালেও যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। টার্মিনাল থেকে যে বাসগুলো ছেড়ে যাচ্ছিল, সেসব বাসে পেছনের সারিতে খালি থাকা আসনে কিছুটা কম টাকায় দর-কষাকষি করে গাড়িতে উঠছিলেন। কেউ আবার ইঞ্জিন কভারে বসে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন। এক-দুটি পিকআপে করেও আরিচা ঘাট পর্যন্ত যাত্রী নিতে দেখা গেছে। ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল ১০০ টাকা।
সেতুর ঢালে যানজট নিরসনের দায়িত্ব পালনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ সেতুর ঢালে বাসের জন্য অপেক্ষা করেন। টার্মিনাল ছেড়ে আসা বাসগুলোও এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। এতে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। কোনো বাস এলেই আমরা সেই বাসগুলোকে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দিচ্ছি না। পিকআপ যাত্রাতেও মানুষদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।’