তেল ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে গাড়ি নিয়ে চালকদের দীর্ঘ সারি। বিজয় সরণি এলাকা, ঢাকা, ২৬ মার্চ
তেল ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে গাড়ি নিয়ে চালকদের দীর্ঘ সারি। বিজয় সরণি এলাকা, ঢাকা, ২৬ মার্চ

সন্তানকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সাড়ে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেলেন তেল

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে মোটরসাইকেলে করে রাজধানীর দয়াগঞ্জ যাচ্ছিলেন সাইদুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নাসিমা সুলতানা, ১১ বছরের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস ও সাত বছরের মেয়ে সাদিয়া মেহজাবিন। বিকেলে ইবনে সিনা হাসপাতালে ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে সিরিয়াল নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাঁরা গাজীপুর থেকে দয়াগঞ্জ যাচ্ছিলেন।

কিন্তু বাসা থেকে বের হয়েই থমকে যেতে হয়। বাসার কাছের এশিয়া ফিলিং স্টেশনে তেল নেই। আশা ছিল, ঢাকায় ঢুকে যেকোনো পাম্প থেকে তেল নেবেন। কিন্তু একের পর এক পাম্পের সামনে একই দৃশ্য—তেল নেই, বিক্রি বন্ধ।

শেষ পর্যন্ত সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিজয় সরণির আগে একটি পাম্পে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখে লাইনে দাঁড়িয়ে যান সাইদুর। রাস্তায় মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। আর ফুটপাতে ছায়ায় আশ্রয় নেন নাসিমা ও দুই সন্তান। দুপুর ১২টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা লাইনে একই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে জানালেন সাইদুর। এরপর ধীরে ধীরে লাইন এগোতে শুরু করে।

বেলা পৌনে ১টার দিকে নাসিমা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাইকে খুব বেশি তেল নেই। হয়তো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারব। কিন্তু ফেরার সময় কী হবে জানি না। রাতে যদি পথে তেল শেষ হয়ে যায়, তাহলে খুব বিপদে পড়তে হবে। তাই কষ্ট হলেও এখানেই অপেক্ষা করছি।’

নাসিমা জানালেন, ২০১৮ সালে ছেলে শাহরিয়ারের শরীরে ব্ল্যাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সেই থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোই তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আজকেও একই কারণে যাওয়া।

তেলের জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে সারিতে সাইদুর রহমান। সঙ্গে ছেলে শাহরিয়ার নাফিস। রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায়

রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত সাইদুর। মাঝেমধ্যে লাইনের একটু নড়াচড়া হলেই মোটরসাইকেল ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বাবার কষ্ট বুঝতে পেরে ছোট্ট শাহরিয়ারও কখনো পেছন থেকে মোটরসাইকেল ঠেলে বাবাকে সাহায্য করছিল।

দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষার ক্লান্তি থেকে ফুটপাতের ছায়াও স্বস্তি দিতে পারছিল না তাঁদের। নাসিমা বলছিলেন, ‘অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। শরীরটা আর সইছে না।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট সাদিয়া কিছুক্ষণ পরপর মাকে একই প্রশ্ন করছিল, ‘আর কতক্ষণ লাগবে মা?’

চার ঘণ্টা পর দুপুর দুইটার দিকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের একদম সামনে বাইক নিয়ে পৌঁছান সাইদুর। তেল পান তারও আধা ঘণ্টা পর বেলা আড়াইটার দিকে। বিকেল তিনটার দিকে সাইদুর মুঠোফোনে জানান, তাঁরা যাত্রাবাড়ী পৌঁছেছেন। সন্তানেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ায় পরিচিত এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছেন।

ফুটপাতে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নাসিমা সুলতানা ও মেয়ে সাদিয়া মেহজাবিন। রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায়

আজ বৃহস্পতিবার বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ টাঙিয়ে বলে রেখেছে, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। তেল বিক্রি কতক্ষণ বন্ধ থাকবে, কখন বিক্রি শুরু হবে—এ বিষয়ে কিছুক্ষণ পর পর মাইকে ঘোষণা দিয়েছিল পাম্প কর্তৃপক্ষ।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পাম্পের সামনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি জাহাঙ্গীর গেট ছাড়িয়ে গেছে। আর মোটরসাইকেলের সারি চলে গেছে ফ্যালকন হলের কাছাকাছি। সকাল থেকেই প্রখর রোদের কারণে রাস্তায় মোটরসাইকেল রেখে ফুটপাতে গাছের ছায়ায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোটরসাইকেলের চালকেরা।

নির্ধারিত সময় দুপুর ১২টা থেকেই তেল বিক্রি শুরু করে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ। এ সময় কথা হয় ট্রাস্ট এনার্জির সহকারী পরিচালক মেজর (অব.) আবুল আলা মুহাম্মদ তৌহীদের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাম্প স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল। গতকাল রাতেই নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সকাল থেকে যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদেরও হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘোষণা শুনে অনেকে চলে গেছেন। তবে বেশির ভাগই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বাবা ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে বাইক ঠেলছিল শাহরিয়ার নাফিস। রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায়

আবুল আলা বলেন, এখন তাঁদের পাম্পে ২৫ হাজার লিটার অকটেন ও ১৯ হাজার লিটার ডিজেল রয়েছে। এই পাম্পে ডিজেলের চাহিদা কম। তাই ডিজেল শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর অকটেন যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ বিক্রি চলবে। তবে এমন কোনো অস্বাভাবিক সময়ে (যেমন ভোররাতে) হঠাৎ করে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে না।

ট্রাস্ট পাম্প থেকেই তেল কেনার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোটরসাইকেলচালক এনামুল হক। পেশায় তিনি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ার চালক। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। গতকাল বুধবার বিকেলে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর এই পাম্প থেকেই তেল নিতে পেরেছিলেন তিনি। তখন পকেটে ছিল মাত্র ৩৫০ টাকা। সেই টাকায় যতটুকু সম্ভব তেল নিয়েই ফিরতে হয়েছিল। তাঁর মোটরসাইকেলের ট্যাংক ভরতে লাগে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকার জ্বালানি।

এনামুল বলছিলেন, ‘অনেক কষ্ট হয়। বিরক্তি লাগে—যা বলার মতো না। তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে সময় নষ্ট হয়। এই সময় কাজে থাকলে আমার কামাই হইতো।’

আজ সকাল থেকে শুরু হয় এনামুলের সেই একই লড়াই। সকাল পৌনে ১০টার দিকে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর মোটরসাইকেল ছিল পাম্প থেকে কিছু দূরে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে।

এনামুল বলেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে গতকালই ফুল ট্যাংক নিতাম। তাহলে অন্তত এক সপ্তাহ আর চিন্তা করতে হতো না। এখন তেলের জন্য বইসা আছি। মাথায় টেনশন হচ্ছে। কখন তেল পাব, কয়টা ট্রিপ দিতে পারব, সংসারের খরচ উঠবে তো—এসব।’ আজ গতকালের আয় করা ১ হাজার ১০০ টাকার তেল নেবেন এনামুল।

আজ সকালে মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস, কল্যাণপুরের কমফোর্ট ফিলিং স্টেশন, খালেক পাম্প ও সোহরাব ফিলিং স্টেশন, শ্যামলীর মেসার্স সাহিল ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ দেখা গেছে। এসব ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও সেখানে পাওয়া যায়নি। বন্ধ পাম্পে বসে অলস সময় পার করছিলেন কর্মীরা। অনেক পাম্পে ঢোকার মুখেই বাঁশ বা রশি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। কোথাও ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ টাঙানো হয়েছে।