
নীলক্ষেত ছাড়াও বাংলাবাজার, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের বিপরীতে, তোপখানা রোডে এবং মিরপুর ১০ নম্বরে পাওয়া যাবে পুরোনো বই।
গলির ভেতর গলি, তার ভেতরে তস্য গলির দোকানেও পাওয়া যেতে পারে মণিমাণিক্যের সন্ধান। যদি সন্ধানকারী হয় জহুরি। ভালো বই খুঁজতে আসা মানুষদের এমন জহুরি বলেই মনে করেন দীর্ঘদিনের পুরোনো বই বিক্রেতারা। চার দশক ধরে পুরোনো বই বিক্রি করেন নীলক্ষেতের সুলতান মাহমুদ। তিনি বললেন, ‘ধুলার আস্তর সরিয়ে যে পাঠক একের পর এক বই খুঁজে নেন, তাঁকে আমরা সম্মান করি।’
আফসোস, এখন আর সেই সব ক্রেতাও নাই, বইয়ের দোকানও নাই। আকার–আয়তনে অনেকটা হলেও রাজধানী ঢাকায় পুরোনো বইয়ের দোকান হরেদরে নেই।
নীলক্ষেতের আগে পুরোনো বইয়ের সম্ভারের দাবিটি ছিল বাংলাবাজারের। তখন টিনের ঘর, টংয়ের দোকান আর ফুটপাতে চট বিছিয়ে ছিল বেচাকেনার ব্যবস্থা। এখন পুরোনো বইয়ের বাজারে রোজ আসে নতুন নতুন বই। দোকানের চেয়ে বেশি দামে পুরোনো বই বিক্রি হয় অনলাইনে। তবু যাঁরা পৃষ্ঠা উল্টে, গন্ধ নিয়ে এবং একটির সুবাদে আরও দুটি ভালো বই খুঁজে বের করতে চান, তাঁরা সময় নিয়ে যান সন্ধানে। এ ছাড়া বাংলাবাজার, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের বিপরীতে, তোপখানা রোডে এবং মিরপুর ১০ নম্বরে পাওয়া যাবে পুরোনো বইয়ের খবর। তবে সৃজনশীল বইয়ের চাহিদা এখন কমছে, বাড়ছে গাইড বইয়ের চাহিদা।
নীলক্ষেতের ভান্ডারে অমূল্য
নীলক্ষেতের দুই নম্বর গলির মুখে আছে এক বর্ষীয়ান তেঁতুলগাছ। দিনের বেলা মানুষের ভিড়ে চোখে পড়ে না। জনশ্রুতি আছে, ষাটের দশকে এই গাছের তলায় চট ছালা বিছিয়ে মোস্তফা নামের একজন বিক্রি করতেন পুরোনো বই। সব ধরনের বই আনতেন তিনি। এখনো নীলক্ষেত একাডেমিক, চাকরির প্রস্তুতি, ইংরেজি সাহিত্য, প্রযুক্তি, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশল, আইন থেকে শুরু করে সাহিত্য, সংস্কৃতির সব বইয়ের স্থান।
এখানে সাধারণত দেশি প্রকাশনীর বই পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ মূল্য ছাড়ে। পুরোনো বই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মূল্য হ্রাসে। বিদেশি বইয়ের দাম নির্ভর করে বইটির সহজলভ্যতার ওপর। সাধারণত ফটোকপির বইগুলো গায়ে লেখা দামের চেয়ে ৪০ শতাংশ মূল্য হ্রাসে বিক্রি হয়। ফটোকপি, আসল কপির নকল ভালো কাগজে পাওয়া যায়। অরিজিনাল কপি পেতে চাইলে খুঁজতে হবে এখানকার পুরোনো বইয়ের দোকানে। সেখানে থাকতেও পারে, না–ও পারে। নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকান ‘আকন বই বিতান’-এর বয়স ৪০ বছরের বেশি।
মালিক সুলতান মাহমুদ জানালেন, তাঁরা পুরোনো বই সংগ্রহ করেন তিনভাবে। ভাঙারিওয়ালারা নিয়ে আসে, মানুষ নিজের বা আগের প্রজন্মের ব্যক্তিগত সংগ্রহ বিক্রি করে এবং শিক্ষার্থীরা বই বিক্রি করে। এই বই বিক্রেতা কথা বলতে বলতে বের করলেন আবুল ফজলের রেখাচিত্র বইটি। লেখা আছে ১৯৬৫ সাল বইঘর, বিপণিবিতান, চট্টগ্রাম। রেখাচিত্র বর্তমানে পুনর্মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হলেও পুরোনো বই সংগ্রাহকদের কাছে আগের বইটি বেশি মূল্যবান। তিনি জানালেন, এই পৃষ্ঠা ছেঁড়া বইটি তিনি ভালো ক্রেতা পেলে চার শ টাকায় বিক্রি করবেন চোখ বন্ধ করে।
নীলক্ষেতে আছে সেকেন্ডহ্যান্ড ইংরেজি বইয়ের সম্ভার। সেসব পাওয়া যাবে ম্যাগাজিন গলি নামে পরিচিত গলিতে। নীলক্ষেতে রাফিন প্লাজার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেই দেখা যাবে দুই পাশে ইংরেজি বইয়ের সংগ্রহ। দুই নম্বর গলির ভেতর দিকে আছে ৫০ বছর বয়সী ফ্রেন্ডস বুক কর্নার। এখানকার স্বত্বাধিকারী নুর আলম চৌধুরী বললেন, সত্তরের দশকে তিনি ১০ টাকা করে বই ভাড়া দিতেন শিক্ষার্থীদের। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন অল্প টাকায় বই নিয়ে পড়ে নোট করতে পারতেন, তেমনি তিনি নিজেও সেই টাকা দিয়ে আরও নতুন বই তৈরি করতে পারতেন। নীলক্ষেতে ফুটপাতে ২০ টাকায় বই বিক্রি করেন আব্দুর রফিক মিয়া। তিনি বললেন, এখানে পাওয়া যায় না এমন কোনো বই নেই। তবে খুঁজে নিতে হবে।
নীলক্ষেতে আছে প্রায় চার শ বইয়ের দোকান। তবে এর মধ্যে কতগুলো শুধু পুরোনো বই বিক্রির জন্য, এর কোনো জরিপ নেই। মার্কেটের শেষ দিকে টাইপিং ও বাইন্ডিং দোকানগুলো। বই কেনার পাশাপাশি পুরোনো বই মেরামত বা বাঁধাই করার সবচেয়ে বড় জায়গাও নীলক্ষেত। বর্ষীয়ান বই বিক্রেতা নুর আলম বললেন, বই নিয়ে ষাটের দশকের কথা। ‘তখন এমন পাঠক ছিল, যারা সত্যিকারের বইয়ের সমঝদার। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এসব ঘটনায় অনেকের স্থানান্তর হয়েছে। ঘরবাড়ি বদলালেই বইপত্রে নাড়াচাড়া পড়ে। সেখান থেকে পুরোনো বই আমাদের কাছে কেজি হিসেবে বিক্রি করতেন ভাঙারিওয়ালারা। তাঁদের কাছ থেকে ইংরেজি ম্যাগাজিন কিনে বিক্রি করতাম। নীলক্ষেতে তখন বেশি হলে সাত থেকে আটজন বই বিক্রেতা ছিলেন। তবে কী সব পাঠক ছিল! তাঁরা ছিল সত্যি সমঝদার।’ তবে পুরোনো বইয়ের রমরমা অবস্থা তখন বাংলাবাজারেই ছিল বলে উল্লেখ করলেন তিনি।
বাংলাবাজারে বইয়ের ঢেউ
বইয়ের তরঙ্গ যেখানে সব সময় থাকে, সে জায়গার নাম বাংলাবাজার। এখানে প্রবেশমুখেই ছিল পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো। এখন নামমাত্র কয়েকটি দোকান আছে। তবে বেশির ভাগ দোকানেই বিক্রি হয় গাইড বই। এখানকার পুরোনো বইয়ের সংগ্রহ থেকে অপসৃত সৃজনশীল সাহিত্যের বই। কিন্তু বাংলাবাজারের জমজমাট ভাবটি সব সময় রয়েছে; কারণ এখানেই দেশের সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল প্রকাশনীর দোকান, গাইড বইয়ের ছাপাখানা। এখানে অপরিসর গলি, গলির ভেতরে থরে থরে বিভিন্ন বইয়ের দোকানই সারাক্ষণ সরগরম রাখে বাংলাবাজারকে। শোনা যায়, গত শতকের পঞ্চাশের দশকে মল্লিক ব্রাদার্স কলকাতা থেকে এসে বাংলাবাজারে সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছিল। বর্তমানে এখানে আছে আগামী, সময় প্রকাশন, অনন্যা, বিদ্যা প্রকাশ, আফসার ব্রাদার্স, অনুপমসহ অনেকগুলো প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠানের বইয়ের ব্যবসা। অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক জানালেন, এখানে তাঁদের পৈতৃকভাবে বইয়ের ব্যবসা। এখানে বইয়ের দোকানগুলো ছিল অধিকাংশ টিনের ঘরের। তখন বাংলাবাজারের প্রবেশমুখে ছিল পুরোনো বই বিক্রির ব্যবস্থা।
বাংলাবাজারে প্রায় পাঁচ দশক ধরে আছে আগামী প্রকাশনী। স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি বললেন, একসময় ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাংলাবাজারের দিকে যেতে ডানে ছিল সিলভার মার্কেট। এ জায়গা ছিল পুরোনো বই বিক্রির জন্য বিখ্যাত। রবীন্দ্র রচনাবলি থেকে শুরু করে সমকালীন লেখকদের সৃজনশীল সাহিত্যের বই, ভারতীয় বাংলা বই, সব পাওয়া যেত এই বাংলাবাজারে। এখন সেই সব পুরোনো বইয়ের দোকান হারিয়ে গিয়েছে। যেমন কমেছে পুরানা পল্টনের পথের পাশের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো।
স্মৃতিময় পুরানা পল্টনের বই
বুদ্ধদেব বসু থেকে অলকানন্দা প্যাটেল, অনেক গুণীজনের স্মৃতিকথায় আছে পুরানা পল্টনের গল্প। সেই পুরানা পল্টন এখন দ্রুত গতিময়। ছন্দ হারিয়েও যেন কী একটা কিছু অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছে পুরানা পল্টন নামের সঙ্গে। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের বিপরীত দিকের বইয়ের দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে বোঝা গেল সে অনুরণন। এখানে আছে ১২ থেকে ১৫টি বইয়ের দোকান। প্রথম দোকানটি আবদুর রহমানের। তাঁর কাছে আছে ২০ টাকার বই। দুই দশক ধরে বই বিক্রি করছেন এখানে বসে। এই দোকান থেকে সামনে এগিয়ে গেলে মোহাম্মদ বাবুল মিয়ার দোকানটি চার দশকের বেশি বয়সী। তিনি জানালেন, আগে এখানে আরও দোকান ছিল। এসবই ভ্রাম্যমাণ দোকান। সেই বই বিক্রেতাদের কেউ কেউ এখন মনোহারি জিনিসপত্র বিক্রি করেন। তাঁর দোকানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে পাওয়া গেল ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত ডমরু চরিত বইটি। এ বইয়ের বর্তমান সংস্করণ থাকলেও বাবুল মিয়ার দোকানের বইটির সংস্করণ ১৯২৩ সালের। আবুল কালাম বললেন, ‘চলতি পথে অনেক মানুষই আসে, বই দেখে তবে ভিড় আর যানজটে আগের মতো মানুষ দাঁড়ায় না।’ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে খুঁজে বের করা গেল অধুনালুপ্ত রাদুগা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লিও তলস্তয়ের পুনরুজ্জীবন উপন্যাসটি। পুরোনো বইয়ের মূল্য কম হলেও এসব দুষ্প্রাপ্য বইয়ের দাম কিন্তু ভালোই।
সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বললেন, বায়তুল মোকাররমের কাছে হাউস বিল্ডিং গলিতে বিদেশি ম্যাগাজিনের সন্ধান পাওয়া যাবে। একসময় তোপখানা রোড দিয়ে সেগুনবাগিচার দিকে প্রবেশপথে ছিল ছোট ছোট কয়েকটি পুরোনো বইয়ের দোকান। সেখানে পাওয়া যেত দুষ্প্রাপ্য সব বই। এখন আর চোখে পড়ে না।
তবে চেনা জায়গা থেকে পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো হারিয়ে গেলেও সময়ের প্রয়োজনেই আবার রাজধানীতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পুরোনো বইয়ের দোকান। যেমন মিরপুর ১০ নম্বরে এখন তৈরি হয়েছে অনেকগুলো পুরোনো বইয়ের দোকান। নীলক্ষেতের মতো অতটা বিস্তৃত না হলেও ৩৫-৪০টি ছোট ছোট বইয়ের দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে মিরপুরের এই পুরোনো বই বাজার। মিরপুর ১০ থেকে পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সামনের ফুটপাত ঘেঁষে শুরু হয়েছে বইয়ের দোকানগুলো। পাঠকের পদচারণে জমে দিনের দ্বিতীয় ভাগ থেকে। চলে রাত ১০টা পর্যন্ত।
পুরোনো বইয়ের পাঁড় পাঠক অধ্যাপক আলতাফ হোসেন। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে হাজারের বেশি পুরোনো বই। তিনি বললেন, শতবর্ষী ছাপা, এককালের জনপ্রিয় হয়েও হারিয়ে যাওয়া, প্রচ্ছদহীন বা দুটো পৃষ্ঠা ইঁদুরে কাটা বইটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যদি তা আমার প্রয়োজনের বইটি হয়। একটা দুষ্প্রাপ্য পুরোনো বই যে বইপ্রেমীর কাছে কতখানি তুরীয় আনন্দের উৎস, তা শুধু বইপ্রেমীই বুঝবেন।