গতকাল শনিবার রাত নয়টা। রাজধানীর আদাবরের মুনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ১২ নম্বর সড়কে আবির এমব্রয়ডারি কারখানা। হঠাৎ দেশি অস্ত্র নিয়ে কারখানাটিতে হামলা চালায় ৮–১০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল। এতে কারখানার দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে কারখানার শ্রমিকেরা মধ্যরাতে আদাবর থানা ঘেরাও করেন। পরে পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে।
এরই মধ্যে এ ঘটনায় কারখানার মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় আটজনকে এজাহারনামীয় ও ৮ থেকে ১০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সেই মামলায় আটক পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ রোববার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রোহান খাঁন রাসেল (৩০), মারুফ (৩৫), হাসান (২৩), মো. রায়হান (২২) ও মো. রোমান (২৪)। পুলিশের ভাষ্য, তাঁদের মধ্যে রোহান খাঁন রাসেল ওরফে কালা রাসেল স্থানীয় এক সন্ত্রাসী দলের নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই গতকাল রাতে কারখানাটিতে হামলা হয়েছে।
আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, আসামি রোহান খাঁন রাসেল আদাবর থানাধীন সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি ও শ্যামলী হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্প বালুর মাঠ এলাকায় কিশোর গ্যাং গ্রুপ পরিচালনা করেন। তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটান। এলাকার লোকজন তাঁদের গ্রুপের সদস্যদের ভয়ে থাকেন।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, নির্বাচনের পর হঠাৎ আদাবর এলাকায় রাসেল ও তাঁর দলের সদস্যদের উৎপাত বেড়েছে। তাঁদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সড়কে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি হচ্ছে। বিশেষ করে এই এলাকার মুনসুরাবাদ হাউজিংয়ের এমব্রয়ডারি কারখানা শ্রমিকদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যান তাঁরা। গত শুক্রবার আবির এমব্রয়ডারি কারখানার দুই শ্রমিকের কাছ থেকে তিনটি মুঠোফোন ছিনতাই করেন তাঁরা।
আবির এমব্রয়ডারি কারখানার শ্রমিকেরা জানান, গতকাল রাত পৌনে ১০টার দিকে কারখানার শ্রমিকেরা কাজ শেষে বেতন–ভাতা নিয়ে বের হলে তাঁদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন কালা রাসেল ও তাঁর দলের সদস্যরা। শ্রমিকেরা ভয়ে আবার কারখানায় ফিরে গেলে আসামিরা সামুরাই, চাপাতি, ছুরিসহ প্রবেশ করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁদের বাধা দিতে গেলে মো. তোফায়েল (২৮) ও হাফিজ আহমেদ (৪৪) নামের দুই কর্মচারীকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন তাঁরা। পরে আহত দুজনকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার বিচার চেয়ে মধ্যরাতে আদাবর থানা ঘেরাও করেন ওই কারখানার শ্রমিকেরা। তাঁরা থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি রাসেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার আসামিদের কারাগারে রাখার আবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং মামলার ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত ও যাচাই–বাছাই সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের জেলে আটক রাখা প্রয়োজন।
আবির এমব্রয়ডারি কারখানার মালিক ও আদাবরের এমব্রয়ডারি কারখানা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কালা রাসেলের ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে তাঁরা অতিষ্ঠ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁর কারখানায় চাঁদা দাবি করে আসছেন রাসেল। চাঁদা না পেয়ে কারখানার শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ও মুঠোফোন ছিনতাই করে নেন। সর্বশেষ গতকাল আবার ছিনতাই করতে এলে শ্রমিকেরা একজোট হয়ে তাঁদের ধাওয়া দেন। এ সময় তাঁরা দুজনকে কুপিয়ে জখম করেন।
মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ছয় মাস ধরে পুলিশের তৎপরতার কারণে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা নিশ্চুপ ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলছে।