
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় সবার জন্য প্রবেশাধিকার আছে এমন মাঠ আছে মাত্র ৪২টি। ঢাকা শহরের মাত্র ১৬ ভাগ এলাকার মানুষ খেলার মাঠের পরিষেবার মধ্যে বসবাস করেন। বাকি ৮৪ ভাগ এলাকার মানুষ খেলার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
আজ বুধবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে নগর সংলাপে ‘ঢাকা মহানগরীর খেলার মাঠ-পার্ক-গণপরিসর সুবিধাদির এলাকাভিত্তিক সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে টেকসই পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই সংলাপের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি), সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ ও নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ।
এই নগর সংলাপে নিবন্ধটি তুলে ধরেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে খেলার মাঠ আছে মোট ২৩৫টি। তার মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪১টি প্রাতিষ্ঠানিক মাঠ রয়েছে, যেখানে সবার প্রবেশাধিকার নেই। সবার প্রবেশাধিকার আছে মাত্র ৪২টি মাঠে। আরও ৫২টি মাঠ রয়েছে, যেগুলো অপ্রাতিষ্ঠানিক কিন্তু সবার প্রবেশাধিকার নেই; যেমন ঈদগাহ ও কলোনির মাঠ।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ওয়ার্ড রয়েছে ১২৯টি। এর মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি ওয়ার্ড আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ড রয়েছে। অন্য ওয়ার্ডগুলোয় খেলার মাঠ থাকলেও সব মাঠ আবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। কিছু মাঠ বেসরকারি ক্লাবের দখলে, কিছু মাঠ বন্ধ আছে উন্নয়নকাজ ও মেলার নামে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীতে হাতে গোনা যে কয়েকটি মাঠ রয়েছে, তার বেশির ভাগই উন্নত এলাকায়। প্রান্তিক এলাকাগুলো যেমন কামরাঙ্গীরচর, আফতাবনগর, জুরাইন, দনিয়ায় খেলার মাঠ নেই বলা চলে। যেসব এলাকায় মাঠ রয়েছে, সেগুলোও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুবিধা ও পরিষেবার অভাবে নারী ও শিশুদের অধিকাংশ প্রবেশ করতে পারে না।
ঢাকা শহরের বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০১০) অনুসারে, প্রতি সাড়ে ১২ হাজার মানুষের জন্য ২ থেকে ৩টি খেলার মাঠ দরকার, যার প্রতিটির আয়তন হবে ন্যূনতম এক একর।
আইপিডির সম্প্রতি এক সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে ৭৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪১টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনায় ৬৫টি, সিলেটে ৪০টি ও বরিশালে ৪৫টি খেলার মাঠের ঘাটতি রয়েছে। যার ফলে এসব নগর এলাকার অধিকাংশ শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে স্বাভাবিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মাঠ ইজারা না দেওয়ার দাবি জানিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কমিউনিটির কাছে মাঠ রাখতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের নামে কাউকে মাঠ দেওয়া যাবে না। বাহাদুর শাহ পার্ক যে কয়েক লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে, এলাকাবাসী বলেছেন সেই কয়েক লাখ টাকা তাঁরা দেবেন। কিছু লোক দখলে নিয়ে ব্যবসা করেন। ইজারা সেখানে বাহানামাত্র। আসলে ইজারা দেওয়া লাগে না। সরকার জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করছে, তাহলে তা কেন দিচ্ছেন মানুষ? রাষ্ট্রের কাছে ৫০ থেকে ৬০টি মাঠের রক্ষণাবেক্ষণের টাকা থাকে না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কারও কারও লোভের বলি হচ্ছে মাঠ। বিশেষ করে উন্নয়নের পরে সুন্দর হয় মাঠ, তখন সেটা আরও বেশি লোভাতুর হয়।
আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার দর্শনে গণপরিসর, খেলার মাঠ অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। কিন্তু মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য খেলার মাঠের প্রয়োজন রয়েছে। জায়গা পাওয়া না গেলে কিনে হলেও প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ কিংবা পার্ক তৈরি করা উচিত সরকারের বলে মনে করেন তিনি।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ অপারেটিং ডিরেক্টর চন্দন জেড গোমেজ বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনীতিবিদেরা মনে না করবেন খেলার মাঠের প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সবার জন্য এই সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।