ফকিরাপুল পানির ট্যাংকের পাশের সড়কের ফুটপাতে কাজের খোঁজে দাঁড়িয়ে আছেন মোহাম্মদ সুমন। লুঙ্গির ওপর কালো টি–শার্ট গায়ে, বাঁ কাঁধে গামছা। তিন দিন ধরে কেউ কাজে নেননি তাঁকে। কেরানীগঞ্জ থেকে রোজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে এখানে এসে তিনি হাজির হন। দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকে ফিরে যান। দুপুরের পর সাধারণত আর কাজ জোটে না। মন খারাপ করে ফিরতি পথ ধরতে হয়।
গতকাল শনিবার সকাল নয়টার দিকে কথা হলো সুমনের সঙ্গে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছে তাঁর। কাজ না পেলেও ক্ষুধা তো মানবে না। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তাঁর পাঁচজনের সংসার। ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয় মাসে। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। প্রতিদিনের মজুরি ৮০০ টাকা। তবে কাজ পেতে পেতে যদি অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, যেমন সকাল ১০টার পর থেকে কাজ পেতে যত সময় যায়, মজুরিও তত কমে আসে।
দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়েই যাচ্ছে, অথচ আমাদের আয় বৃদ্ধি দূরের কথা, আরও কমে যাচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলবে!লিটন মিয়া, টাইলস মিস্ত্রি
স্বাধীনতার পর থেকেই ফকিরাপুল পানির ট্যাংকের পাশের ফুটপাতে গড়ে উঠেছে এই শ্রমবাজার। এখন প্রতিদিন এখানে ৩০০–৪০০ মানুষ শ্রম বিক্রি করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে আছেন নির্মাণ–সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকার কাজের মিস্ত্রি। যেমন কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি ও তাঁদের সহকারী; আছেন সাধারণ দিনমজুর, ভ্যানচালক এমন অনেক পেশার মানুষ। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সবারই কাজ কমে গেছে। বিশেষ কাজের পারদর্শী মিস্ত্রি থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত সবাই খুব অর্থসংকটে পড়েছেন। প্রত্যেকেই সপ্তাহে তিন-চার দিন বেকার থাকছেন বলে জানান। কেউ কেউ টানা এক সপ্তাহের বেশি সময়ও কাজ পাচ্ছেন না।
সুমনের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর বলিগঞ্জে। সেখানে জ্ঞাতিগোষ্ঠী আছে, কিন্তু নিজের ঘরবাড়ি নেই। কিশোর বয়সে কেরানীগঞ্জে এসেছিলেন। এখন বয়স ৪৫ বছর। বরাবরই দিনমজুরি করেছেন। মাঝখানে অন্য রকম কিছু করতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন। কিছু টাকা জমে ছিল হাতে। সেই টাকা আর সমিতি থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনেছিলেন ২০২২ সালে। তাঁর কপালটাই খারাপ। বছর না ঘুরতেই অটোর ‘ব্যাটারি বসে’ যায়। এর পর থেকেই এটা–ওটা নানা রকম ঝামেলা হতেই থাকে। উপায়ান্তর না পেয়ে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়ে আবার ফিরেছেন দিনমজুরির পেশায়। তাঁর স্ত্রীর কিছু জমানো টাকা ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে সমিতির ঋণ শোধ করেছেন। তবে এখনো ৪০ হাজার টাকার মতো তাঁর দেনা রয়ে গেছে।
সুমন মিয়া বললেন, বছর দুয়েক ধরে তাঁর কাজ কমে গেছে। এখন খুব বেশি হলে মাসে ১৫ দিন কাজ পান। সব দিনে আবার পুরো মজুরি পাওয়া যায় না। ফলে মাসে তাঁর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বেশি আয় হয় না। তাঁর স্ত্রী কেরানীগঞ্জেই গৃহকর্মীর কাজ করেন। মাসে তিনি আয় করেন চার হাজার টাকার মতো। কোনোরকমে দুজনের আয়ে সংসার চলছে।
জামালপুরের লিটন মিয়া টাইলস মিস্ত্রি। ১৭ বছর ধরে ঢাকার ফকিরাপুল এলাকাতেই আছেন। কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে দুই সন্তান আর স্ত্রীকে গত বছর গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সংসার গুটিয়ে তিনি এখন মেসের বাসিন্দা। কাজ পাওয়ার ওপর নির্ভর করে স্ত্রীর কাছে সপ্তাহে বা ১০ থেকে ১২ দিন পর বিকাশে টাকা পাঠান। এতেও যে খুব বেশি সুবিধা হচ্ছে, তা নয়। ঢাকায় তাঁর মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। ফুটপাতের দোকানে একবেলা খেতেও ১০০ টাকার কমে হয় না। শুধু ডাল–সবজি দিয়ে খেলেও ৭০ টাকা লাগে।
লিটন জানান, তাঁর প্রতিদিনের পারিশ্রমিক ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে সরকার পতনের পর থেকেই নির্মাণকাজে মন্দা। ঠিকাদারি কাজ প্রায় বন্ধই ছিল। ঠিকাদারদের কাজের ওপরেই প্রধানত টাইলস, রং, স্যানিটারি মিস্ত্রিদের কাজ পাওয়া নির্ভর করে। এখন নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে আশা করছেন, কিন্তু ঠিকাদারির কাজ এখনো শুরু হয়নি।
হতাশা প্রকাশ করে লিটন বলেন, ‘নতুন সরকার শুরুতে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইরান যুদ্ধের কারণে। দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়েই যাচ্ছে, অথচ আমাদের আয় বৃদ্ধি দূরের কথা, আরও কমে যাচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলবে!’
সুমন মিয়া বললেন, বছর দুয়েক ধরে তাঁর কাজ কমে গেছে। এখন খুব বেশি হলে মাসে ১৫ দিন কাজ পান। সব দিনে আবার পুরো মজুরি পাওয়া যায় না। ফলে মাসে তাঁর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বেশি আয় হয় না। তাঁর স্ত্রী কেরানীগঞ্জেই গৃহকর্মীর কাজ করেন। মাসে তিনি আয় করেন চার হাজার টাকার মতো। কোনোরকমে দুজনের আয়ে সংসার চলছে।
বাকেরগঞ্জের কৃষ্ণকাঠি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি জসিম বিশ্বাসের অবস্থাও একই। ফুটপাতে রাখা একটি ভ্যানগাড়ির ওপর বসেছিলেন তিনি। পাশেই ছিলেন ঝালকাঠির কাঠমিস্ত্রি মো. শাহ আলম, কুমিল্লার চান্দিনার রাজমিস্ত্রি আবুল কালাম ও তাঁর জোগালি জামালপুরের চরউজানপাড়ার রমজান শেখসহ এমন বেশ কয়েকজন।
জসিম বিশ্বাস জানান, চলতি মাসে গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাঁর সাকল্যে আট হাজার টাকা রোজগার হয়েছে। কাঠমিস্ত্রিদের এখন কাজ নেই বললেই চলে। তিনি শান্তিনগরে মেসে থাকেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান গ্রামে থাকেন। গ্রামে তাঁর শুধু বসতবাড়ি আছে। জমিজমা নেই। কেমন করে চলছে জানতে চাইলে বললেন, ‘আল্লায় চালায় নেন’।
ফকিরাপুল এলাকায় সকালে এক ঘণ্টার বেশি সময় থেকে দেখা গেল, শতাধিক মানুষ এখানে কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন। এটা তাঁদের জীবনের প্রতিদিনের দৃশ্য। খুব ভোরে এসে তাঁরা এখানে হাজির হন। কাজ পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করেন। সময় যেতে থাকে। কেউ কাজ পান, কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যান।
রিকশাভ্যানের চালকদেরও কাজে মন্দা। রংপুরের পীরগাছার ভ্যানচালক মো. আশরাফুল বলেন, তাঁরা ফকিরাপুল এলাকার ছাপাখানা ও কাঁচা বাজারের মালামাল আনা–নেওয়ার কাজই বেশি করেন। এ ছাড়া মাসের শেষ ও প্রথম সপ্তাহে বাসাবদলের কাজ থাকে। সম্প্রতি তাঁদের কাজ কমে যাওয়ার একটা কারণ হচ্ছে, প্রচুর অটোরিকশা ভ্যান নেমেছে। অটোভ্যানের চালকেরা ভাড়াও কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা ৫০০ টাকায় যে ভাড়া নিতেন, এখন অটোভ্যান সেই ভাড়া খাটছে ২৫০–৩০০ টাকায়।
ফকিরাপুল এলাকায় সকালে এক ঘণ্টার বেশি সময় থেকে দেখা গেল, শতাধিক মানুষ এখানে কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন। এটা তাঁদের জীবনের প্রতিদিনের দৃশ্য। খুব ভোরে এসে তাঁরা এখানে হাজির হন। কাজ পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করেন। সময় যেতে থাকে। কেউ কাজ পান, কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যান।
জসিম বিশ্বাস জানান, চলতি মাসে গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাঁর সাকল্যে আট হাজার টাকা রোজগার হয়েছে। কাঠমিস্ত্রিদের এখন কাজ নেই বললেই চলে। তিনি শান্তিনগরে মেসে থাকেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান গ্রামে থাকেন। গ্রামে তাঁর শুধু বসতবাড়ি আছে। জমিজমা নেই। কেমন করে চলছে জানতে চাইলে বললেন, ‘আল্লায় চালায় নেন’।