নিজের উপার্জনের টাকায় গড়া বাড়িতে থাকতে পারেন না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শারীরিকভাবে পঙ্গু এই বৃদ্ধকে থাকতে হচ্ছে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে। তাঁর অভিযোগ, নিজের ছোট সন্তান ও তাঁর স্ত্রী মিলে তাঁকে বাড়িছাড়া করেছেন।
ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধের নাম এম মো. আলী। রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় তাঁর ছয়তলা বাড়ি। মো. আলী প্রথম আলোকে বলেন, জীবনের একটি বড় সময় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে এই বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়ির পাশাপাশি একটি পোশাক কারখানাও গড়ে তুলেছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে।
মো. আলী এখন বড় ছেলে ওয়াহিদ জুবায়েরের সঙ্গে উত্তরার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকেন। মো. আলীর অভিযোগ যে ছোট ছেলের বিরুদ্ধে, তিনি বাবার ওই ছয়তলা ভবনে থাকেন। বাবার পক্ষ নেওয়ায় নিজেও মামলার হয়রানিতে পড়েছেন বলে বড় ছেলে দাবি করেন। ছোট ছেলের পাল্টা অভিযোগ, তাঁর ভাই এই সম্পত্তি দখল করতে বাবাকে ব্যবহার করছেন।
নিজের বাড়িতে না থাকা নিয়ে মো. আলী বলেন, ছেলে ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছেন। কোথাও আশ্রয় নিলে সেখানে গিয়ে বা ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়। যাঁরা তাঁকে আশ্রয় দেন, তাঁদেরও চাপ দেওয়া হয়। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে বড় ছেলের বিরুদ্ধেও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই বৃদ্ধ বলেন, তিনি এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি নিজের বাড়িতে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ চাইছেন।
বাড়ি দখল ও নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে মামলা ও একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন মো. আলী। বাড়ির দখল পুনরুদ্ধারে গত বছরের মে মাসে তিনি আদালতে মামলা করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছোট ছেলে এম এম মাহমুদ সাঈদ বাড়িটি দখল করে রেখেছেন। মাহমুদ ও স্ত্রী ওয়াহিদা বেগম তাঁর গলায় ছুরি ধরে তাঁকে বাসা থেকে বের করে দেন।
বাড়ি দখলের অভিযোগের বিষয়ে ছেলে এম এম মাহমুদ সাইদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা তিন বছর আগে প্যারালাইজড (শারীরিকভাবে পঙ্গু) হন। এরপর তাঁর বড় ভাই ওয়াহিদ যোবায়ের ভুল বুঝিয়ে বাবার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। বড় ভাই বাবার সমস্ত সম্পদ দখল করতে চাইছেন।
মাহমুদ সাঈদ জানান, তিনি তাঁর বাবার বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। বাড়ির কিছু ফ্ল্যাট খালি রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁর বাবা এখনো নিয়মিত ভাড়া নেন।
ছোট ভাইয়ের অভিযোগের বিষয়ে বড় ভাই ওয়াহিদ যোবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, বাড়ি লিখে দিতে ছোট ভাই তাঁর বাবাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিল। কয়েকবার বাবাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। সে জন্য তিনি বাবাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসেন। বাবাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে তাঁকেও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
বাড়ি দখল নিয়ে বাবা–ছেলে ও ভাইদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা একাধিক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাড়ির মালিক মো. আলী একটি মামলা করেন তাঁর ভাড়াটিয়া মো. কামাল শাহরিয়ার, তাঁর স্ত্রী ফৌজিয়া খাতুন ও তাঁদের ছেলে ফারহানের বিরুদ্ধে। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, কামাল শাহরিয়ারের কাছে প্রায় দেড় লাখ টাকা ভাড়া বকেয়া ছিল। সেই টাকা চাওয়ায় কামাল শাহরিয়ার ১৫–২০ জন সন্ত্রাসী নিয়ে বাড়িতে গিয়ে তাঁর বড় ছেলে ওয়াহিদ যোবায়েরকে হত্যার চেষ্টা করেন।
মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত বছরের ১০ জানুয়ারি কামাল শাহরিয়ার, ফৌজিয়া ও ফারহানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাবিউল আলম গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়ার দেড় লাখ টাকা পরিশোধ না করার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে ভাড়াটিয়া কামাল শাহরিয়ার যে ১৫–২০ জন সন্ত্রাসীকে ওই বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের শনাক্ত করা যায়নি।
মো. আলী এই মামলা করার পর গত নভেম্বরে ভাড়াটিয়া শাহরিয়ার মালিকের বড় ছেলে ওয়াহিদ যোবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, বাসার ভাড়া নিয়ে দ্বন্দ্বে জেরে ওয়াহিদ যোবায়ের তাঁর বাসা থেকে টেলিভিশন, একটি ল্যাপটপ সরিয়ে নিয়ে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন। তাঁর ছেলে ফারহান শাহরিয়ার এতে বাধা দিলে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারতে উদ্যত হন।
ভাড়াটিয়া কামাল শাহরিয়ারের মামলাটি প্রথম তদন্ত করে কাফরুল থানা পুলিশ। থানা পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দেয়।
পরে বাদী কামাল শাহরিয়ারের আবেদনে মামলাটি পুনঃ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। সিআইডি গত ৩১ মার্চ তদন্ত শেষে ওয়াহিদ যোবায়েরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।
ওয়াহিদ যোবায়ের বলেন, ছোট ভাইয়ের পরামর্শে বাড়ির ভাড়াটিয়া তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শফিউল্লাহ রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেবেন না।