আলোচনা ও স্মৃতিচারণা পর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ
আলোচনা ও স্মৃতিচারণা পর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ

স্মরণানুষ্ঠানে বক্তারা

বই যে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, সেটি মহিউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন

গান, গল্প, স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউপিএলের প্রতিষ্ঠাতা ইমেরিটাস প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদকে স্মরণ করা হলো বৃহস্পতিবার বিকেলে। রাজধানীর ফার্মগেটে (গ্রিন রোড) ইউপিএলের প্রধান কার্যালয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মহিউদ্দিন আহমেদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২২ জুন, তিনি ২০২১ সালে প্রয়াত হন। সে উপলক্ষেই তাঁর সহকর্মী, সুহৃদ, অনুরাগী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইউপিএল এই আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন ইউপিএলের বিক্রয় ও মানবসম্পদ পরিচালক তাহমিনা খানেজ। অতিথিদের শুভেচ্ছা জানান প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে মাহরুখ মহিউদ্দিন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর ছিল ইমেরিটাস প্রকাশ মহিউদ্দিন আহমেদের জীবন ও কর্মের ওপরে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী।

আলোচনা ও স্মৃতিচারণা পর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বই যে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, সেটি মহিউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও মননশীল গ্রন্থ প্রকাশের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। বলা চলে তাঁর হাত ধরেই আমাদের দেশে আধুনিক প্রকাশনার বিকাশ ঘটেছে।’

অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বেই প্রকাশনায় অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন কাগজে ছাপা বইয়ের চেয়ে ‘ই-বুক’–এর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে পাঠক বিশেষত গবেষক ও শিক্ষার্থীরা পুরো একটি বইয়ের পরিবর্তে কোনো বই থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় অংশটি ই-বুক আকারে প্রকাশকদের কাছ থেকে কিনে নিতে পারছেন। তিনি ইউপিএলসহ দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমানের পাঠকের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেন।

স্মৃতিচারণা পর্বে নারী অধিকার নেত্রী হামিদা হোসেন গল্পের মতো করে মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। পাকিস্তান আমলে করাচিতে তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল। সেখানে মহিউদ্দিন আহমেদ অক্সফোর্ড পাবলিকেশন লিমিটেডে কাজ করতেন। দেশ স্বাধীনের পরে তিনি কীভাবে ইউনিভার্সিটি পাবলিকেশন লিমিটেড গড়ে তুললেন, প্রকাশনার ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা, পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা—এসব বিষয়ে তিনি স্মৃতিচারণা করেন।

স্মৃতিচারণা করেন নারী অধিকার নেত্রী হামিদা হোসেন

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, প্রকাশক হিসেবে ছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও মহিউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের প্রকাশনার অগ্রগতির ক্ষেত্রে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইউপিএলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি নিজেকে সম্মানিত বোধ করেন।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমেদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ব্যক্তিগতভাবে মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁর অনেক গুণের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ ছিল—যে কাজই তিনি করতেন, তা নিখুঁত ও যথাযথভাবে করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

আলোচনায় অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল

মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেন অনুপম প্রকাশনীর প্রকাশক মিলন কান্তি নাথ। তিনি বলেন, একটি জাতীয় গ্রন্থনীতির জন্য তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাছে ২০ বছর আগে তাঁরা একটি খসড়া গ্রন্থনীতি জমা দিয়েছিলেন; কিন্তু আজও তা আলোর মুখ দেখেনি।

অ্যাডর্নের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘প্রকাশনা যে কেবল বই ছাপার বিষয় নয়, এটি একটি উন্নত মানের শিল্পকর্ম, মহিউদ্দিন আহমেদ আমাদের দেশের প্রকাশকদের তা দেখিয়েছেন। প্রথম থেকেই ইউপিএলের বই অন্য সব প্রকাশনীর চেয়ে আলাদা ছিল।’

মহিউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী অধ্যাপক মেহতাব খানম স্মৃতিচারণা করে বলেন, সাহিত্যরুচি ও পঠন-পাঠনের বিষয়ে দুজনের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও পারিবারিক জীবন তাঁদের ভালোই কেটেছে।

পরে মহিউদ্দিন আহমেদের প্রিয় গানসহ বেশ কিছু গান শুনিয়েছেন শিল্পী সায়ান, সমগীতের বীথি ঘোষ, রেবেকা নীলা, নাভিন মুর্শিদ, মাহরুখ মহিউদ্দিন, সৈয়দ হাসিব উদ্দিনসহ ইউপিএলের কর্মীরা।