৩ কোটি ২২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতি সিটি ব্যাংকের

এবার বিদেশে থাকা গ্রাহকের কার্ডে ঢাকায় লেনদেন!

বিদেশি ব্যাংকের কার্ড, কার্ডধারীরাও বিদেশে। অথচ সেই সব গ্রাহকের কার্ডের তথ্য দিয়ে ৩ কোটি ২২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৭ টাকা লেনদেন হয়েছে রাজধানী ঢাকার উত্তরার একটি আবাসিক হোটেলে স্থাপিত পয়েন্ট অব সেল (পিওএস-পস) যন্ত্রে। ওই হোটেলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহকের হয়ে সেই দায় শোধ করেছে দেশের দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড।
সিটি ব্যাংকও কার্ড ইস্যুকারী বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ওই টাকা পেয়েছিল। কিন্তু কার্ড গ্রাহকেরা ওই সব লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করলে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে টাকা ফেরত দিতে হয়েছে সিটি ব্যাংককে। ফলে আর্থিক ক্ষতি গুণতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পিওএস যন্ত্রে কারসাজি করে এই জালিয়াতি করেছে হোটেলটি।
রাজধানীর গুলশান থানায় সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা মামলা এবং ব্যাংকের অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এটিএম বুথে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনার রেশ না কাটতেই পিওএস যন্ত্রে জালিয়াতির এই অভিযোগ উঠল।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলেছে, বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, দেশীয় ডাচ্-বাংলা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহকও কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় টাকা খুইয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
এটিএম বুথে কার্ড জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিক পিওতর সিজোফেন ও দ্য সিটি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের তিন কর্মকর্তা দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে রয়েছেন।
দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় গুলশানে। পস যন্ত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা নেওয়ার অভিযোগে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ও জ্যেষ্ঠ সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম আইয়ুব উল্যা গত মঙ্গলবার রাতে গুলশান থানায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে মামলা করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে উত্তরার আবাসিক হোটেল কমফোর্ট ইন-এর মালিক আবদুল হাসনাতকে। তবে হোটেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা কোনো জালিয়াতি করেনি। এর সপক্ষে তথ্য-প্রমাণও তাদের কাছে আছে। হোটেলটি উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কে অবস্থিত।
এজাহারে বলা হয়, কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে প্রতারণামূলকভাবে অন্যের তথ্য চুরি করে টাকা নেওয়া হয়েছে।
গুলশান থানার পুলিশ বলেছে, মামলাটি গুলশান থানা থেকে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হবে।
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। বাদীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আবাসিক হোটেলের মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এজাহারের বরাত দিয়ে গতকাল বুধবার গুলশান থানার পুলিশ বলেছে, হোটেল কমফোর্ট ইন-এর মালিক আবদুল হাসনাত গত বছরের ১২ জানুয়ারি ওই হোটেলে একটি পস টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেন। ৯ মার্চ হোটেলটিতে পস যন্ত্র স্থাপন করা হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষ বিদেশি কার্ড গ্রাহকদের কার্ডের সংরক্ষিত তথ্য চুরি করে তা পস যন্ত্রে অবৈধভাবে ব্যবহার করে ৮ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১৪০টি ম্যানুয়াল কি এন্ট্রি ট্রানজেকশনে মোট ৩ কোটি ২২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৭ টাকা লেনদেন করে। প্রতিটি লেনদেনের পরদিন হোটেল কর্তৃপক্ষকে টাকা পরিশোধ করে ব্যাংক। সিটি ব্যাংকও লেনদেনের বিপরীতে বিদেশি ব্যাংকের কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই টাকা বুঝে পায়। কিন্তু বিদেশি কার্ডের মালিকেরা তাঁদের কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। কার্ড ইস্যু করা বিদেশি ব্যাংকগুলো ভিসা ও মাস্টার কার্ডের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কার্ডের বিপরীতে আগে পরিশোধ করা সব টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্ড সেটেলমেন্টের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে ফেরত নিয়ে যায়।
এজাহারে আরও বলা হয়, জালিয়াতির এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। সিটি ব্যাংক লিখিতভাবে দাবি করা সত্ত্বেও সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী হোটেল কমফোর্ট ইন টাকা ফেরত দেয়নি। হোটেলের ওই সব লেনদেনের বিবরণী এজাহারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে মামলার বাদী এ কে এম আইয়ুব উল্যা গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, হোটেলের মালিক কার্ডে গ্রাহকের সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে জালিয়াতি করে টাকা তুলে নিয়েছেন। এতে সিটি ব্যাংক বিদেশি ব্যাংককে টাকা ফেরত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে হোটেল কমফোর্ট ইন-এর গভর্নিং বডির সদস্য ও আবদুল হাসনাতের ভাতিজা আবুল হাসনাত হাসু প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের হোটেল চার তারকা। এখানে বিদেশিরা ওঠেন। তাঁরা কার্ড ব্যবহার করেন। ব্যাংক তো যাচাই করেই টাকা দিয়েছে। তাহলে এত দিন পর এই অভিযোগ উঠছে কেন, মামলাই বা কেন? আদালতে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তাঁরা টাকা ফেরত দিয়ে দেবেন।
কার্ডে আরও জালিয়াতি: স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একজন নারী গ্রাহক গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেন, তাঁর ব্যাংক হিসাব থেকে তাঁর অজান্তে ৫৫ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একজন গ্রাহক। আর প্রিমিয়ার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজেরা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, সৌদি আরবভিত্তিক আল রাজি ব্যাংকের পাঁচজন বিদেশি গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করে বিকল্প বা ক্লোন কার্ডের মাধ্যমে ব্যাংকটির চারটি বুথ থেকে ৩৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বিদেশি গ্রাহকদের কার্ডগুলো ভিসা ব্র্যান্ডের হওয়ায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের বুথ থেকে এ টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আল রাজি ব্যাংকের কী পরিমাণ কার্ড ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানতে চেয়ে সব ব্যাংকে চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির জবাবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক জানায়, ফেব্রুয়ারিতেই আল রাজি ব্যাংকের ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে ৪০০ বার টাকা তোলা হয়েছে। তবে সেই সব লেনদেনের কতগুলো বৈধ আর কতগুলো অবৈধ, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের বুথ থেকে গত মাসে আল রাজি ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে ব্যাংকের বুথে আটকে যাওয়া এটিএম কার্ড নতুন করে ইস্যুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা সব ব্যাংকের নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) লেনদেনের ক্ষেত্রে বুথে আটকে যাওয়া কার্ডের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আবেদন প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন করে কার্ড ইস্যু করতে হবে।
এক হাজার ‘নকল’ এটিএম কার্ড জব্দ: ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল সকালে এক হাজার এটিএম কার্ড জব্দ করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইটের কুরিয়ার গেট থেকে এগুলো জব্দ করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দাদের দাবি, জব্দ হওয়া এটিএম কার্ডগুলো নকল।
শুল্ক ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এটিএম কার্ডের চালানটি থাইল্যান্ড থেকে হংকং হয়ে টাইগার এয়ারের একটি ফ্লাইটে করে ঢাকায় আসে। প্যাকেটের ওপর পাঠানোর তারিখ উল্লেখ ছিল না।