>

* সবাই চায় সাংসদের আনুকূল্য * ছয় মাসে তিনজন খুন। তাঁদের একজন পথচারী নারী
মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে হানাহানির ঘটনা ঘটছে। এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতে যুক্ত আওয়ামী লীগের তিনটি পক্ষই স্থানীয় সাংসদের আনুকূল্য ধরে রাখতে চায়। সংঘাতের এটাও একটা কারণ। আর, এদের দ্বন্দ্বের জেরে সর্বশেষ প্রাণ গেছে পথচারী এক নারীর।
এই তিনটি পক্ষ হচ্ছে পলাশ-রোহান গ্রুপ, ডন গ্রুপ ও রাসেল গ্রুপ। এর মধ্যে পলাশ-রোহান গ্রুপের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সৈকত রোহান গত ৩১ আগস্ট প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এ মামলার অন্যতম আসামি হলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেড এ মাহমুদ ওরফে ডন।
রোহান খুনের আগে ১৭ জুলাই টুটপাড়ায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় একই গ্রুপের আল আমিন ওরফে তুহিনকে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর দুই মাস পর একই গ্রুপের আরেক সদস্য ফয়সাল ইসলামের (সবুজ) পায়ের রগ কেটে নগরের লবণচরা এলাকায় ফেলে রাখে দুর্বৃত্তরা।
এই বাহিনীর প্রধান পলাশ শেখ এখন কারাগারে। তাঁর প্রতিপক্ষ ডনকে তিন দফা হত্যার চেষ্টা হয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার দুপুরে দোলখোলার মোড়ে ডনের দিকে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন পথচারী নারী শিপ্রা কুণ্ডু (৫০)। তিনি পূজার জন্য ফুল কিনে তখন ওই পথ দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন।
এদিকে ডন হঠাৎ সাংসদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠায় তাঁর সঙ্গে খুলনা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
খুলনার স্থানীয় রাজনীতিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তাঁরা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকার কারণে এসব দুর্বৃত্ত বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ কারণে খুলনায় রক্তপাতের রাজনীতি আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, খুলনা শহরে বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরেফিরে পলাশ শেখ, ডন ও রাসেল এবং অনুসারী নেতা-কর্মীদের নামই সামনে আসছে। তিনটি পক্ষই স্থানীয় সাংসদ ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানের অনুসারী দাবি করে। তাঁদের দ্বন্দ্বের কারণে গত ছয় মাসে শহরে তিনজন নিহত হন।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় লোকজন জানান, মিজানুর রহমান ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন। এরপর পলাশ-রোহান গ্রুপের উত্থান হয়। তারা তখন খুলনা এম এম সিটি কলেজ ও সরকারি আযম খান কমার্স কলেজে স্বদলীয় প্রতিপক্ষকে হটিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরই মধ্যে খুলনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন সাংসদ মিজানুর রহমান। তখন ডনের সঙ্গে সাংসদের সম্পর্ক ছিল শীতল। এটাকে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ডনের কাউন্সিলর না হওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন তাঁর অনুসারীরা।
সাংসদের সুনজরে থাকার সুবাদে শহরে মাদক ব্যবসারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে পলাশ-রোহান গ্রুপ। নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকার একসময়ের চায়ের দোকানি হান্নান শেখের ছেলে পলাশ শেখ নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা দাবি করলেও সংগঠনে তাঁর কোনো পদ নেই। হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে।
একপর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন পলাশ। তাঁকে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁকে ছাত্রলীগ নেতা উল্লেখ করে তাঁর মুক্তির দাবিতে পুরো নগরে পোস্টার লাগানো হয়। পোস্টারে পলাশের ছবির পাশাপাশি ছিল সাংসদ মিজানুর রহমানের ছবিও। কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসেন পলাশ।
গত বছরের ১২ মার্চ নগরের নিরালা মোড়ে সাংসদ মিজানের ভাগনে তানভীর আহমেদকে (রিয়াদ) মারধর করে পলাশের ক্যাডাররা। এরপর সাংসদের বিরাগভাজন হন পলাশ। ৯ এপ্রিল তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই থেকে কারাগারে আছেন। এরই মধ্যে সাংসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ডন।
পলাশকে এখন আর নিজের লোক বলে স্বীকার করেন না সাংসদ মিজানুর রহমান। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, পলাশ তাঁর অনুসারী নন। পলাশকে ওইভাবে চেনেন না।
পলাশের মুক্তির দাবি করে লাগানো পোস্টারে সাংসদের ছবি থাকা এবং ছাত্রলীগের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটার সময় সাংসদের পাশে পলাশের থাকার কারণ জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, পোস্টারে ছবি ছাপার পরপর তিনি সব পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার ব্যবস্থা করেন। আর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁর পাশে কে ছিলেন, তা তিনি জানেন না।
ডনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ মিজান বলেন, ‘ডন আওয়ামী লীগের নেতা, আমিও। ডনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো।’
পলাশ গ্রুপের একাধিক সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা মনে করেন, ডন ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর সাংসদের আনুকূল্য হারিয়েছেন পলাশ।
পলাশ গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে লিয়ন শরীফ (এখন কারাবন্দী), মুন্না, লিটন শেখ, রনি ওরফে কালা রনি ও তাঁর ভাই তানভীর হোসেন (রকি), অমিত ও মো. রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পলাশ একজন সন্ত্রাসী। তাঁকে বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন। তিনি যখন যে পাত্রে যান, তার রং ধারণ করেন।
পলাশ কারাগারে যাওয়ার পর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন ডন ও আসাদুজ্জামান ওরফে রাসেল। দুজনই এখন সাংসদের অনুগত। কিন্তু কে সাংসদের বেশি আনুকূল্য পাবেন, তা নিয়ে দুজনের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা ডন ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। গত মেয়াদে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। একসময় তিনিও মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
জেলা ছাত্রলীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে মাদক ব্যবসা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে ডনের সঙ্গে পলাশের বিরোধ বাধে।
জেড এ মাহমুদ ডন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনি মাদক ব্যবসার বিরোধিতা করে আসছেন। এ কারণে পলাশ ও তাঁর লোকজন গত বছরের ৬ জানুয়ারি তাঁর বাড়িতে হামলা করেছে। ২৭ সেপ্টেম্বর শহরের দোলখোলা এলাকায় তাঁর ওপর বোমা হামলা করা হয়। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে হত্যার জন্য গুলি করা হয়। ডনের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিটি ঘটনায়ই উদাসীন থেকেছে।
খুলনা সদর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার মাস তিনেক আগে পুলিশ ইয়াবার দুটি চালান ধরেছিল। সেই চালান দুটি পলাশের ছিল। পলাশ ও লিয়ন কারাগারে থাকায় তাঁদের লোকজন মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা ঠিকমতো করতে পারছে না। সে কারণেই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে।
ডনের ওপর হামলার পর ওই দিন সাংসদ মিজানুর রহমানও সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মাদককে কেন্দ্র করেই ঘটনাটি ঘটেছে।
স্থানীয় সাংসদের এই দাবির বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনি কেন এটা বলেছেন, তা বলতে পারব না। এটা তদন্তের বিষয়। যারা খুন করেছে, তারা খুনি এবং অস্ত্রধারী। আমাদের কাজ হচ্ছে খুনিকে ধরা এবং অস্ত্র উদ্ধার করা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পলাশের পক্ষের লোকেরাই ডনের ওপর হামলা করেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁর অনুসারী নাঈম, শাওন, কসাই শাহীন, বাবু, ঝঙ্কার, মেশিন সুজন ও ইমরানকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেল ও ডনের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তাঁদের ধারণা ছিল, এ দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের কোনো মারামারি হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনাটি ঘটে। পুলিশের কারও কারও সন্দেহ, সর্বশেষ হামলার ঘটনায় রাসেল গ্রুপের ইন্ধন থাকতে পারে।
ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৮ জুন ছাত্রলীগের খুলনা মহানগর কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক হন সাংসদ মিজানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আসাদুজ্জামান রাসেল। এরপর মিজানের হয়ে নগরের বিভিন্ন কলেজের নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদের কাছাকাছি থাকা এবং নগরীর ২৭, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাসেল ও ডনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। গত ১৯ ডিসেম্বর নগরীর সাতরাস্তা মোড়ে রাসেলের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান ডনের অনুসারী দাদো মিজান ও তাঁর লোকেরা।
অবশ্য রাসেল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ডন ভাই আর আমি একই। ডন ভাইয়ের লোক আমার, আর আমার লোক ডন ভাইয়ের। ছোটদের মধ্যে কিছু সমস্যা হয়েছিল। সেটা নিয়ে আমার অফিসের বাইরে একটু ঝামেলা হয়েছিল।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে মাদকের সিন্ডিকেট। আর এর সবই হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। কিছু কিছু ওয়ার্ড কাউন্সিলরও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
সাংসদ মিজানুর রহমান দাবি করেন, খুলনায় মাদকের বিস্তার রোধে তাঁরা একের পর এক কর্মসূচি পালন করছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারছেন না। মাদক ব্যবসায়ীদের কে ইন্ধন দিচ্ছে, তা-ও তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘পুলিশ দেখি মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে। তার কিছুদিনের মধ্যেই তারা বেরিয়ে যায়।’
তবে কি পুলিশ ইন্ধন দিচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে সাংসদ বলেন, ‘পুলিশ ইন্ধন দিচ্ছে কি না জানি না। তবে পুলিশ আরও কঠোর হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
খুলনায় মাদকের বিস্তারের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি। তিনি বলেন, ‘মাদকের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। এখানে কোনো দলীয় পরিচয় দেখা হবে না।’