ঝালকাঠির সদর ও রাজাপুর উপজেলায় প্রায় ২ কোটি টাকার খাল খননের কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খাল খননের নামে পাড় ছাঁটা হয়েছে। খালপাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ইউনিয়ন পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির মাধ্যমে খাল খননের কাজ করছে। এতে অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইফাদ।
প্রকল্প সহায়তাকারী মো. দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে দুটি পর্যায়ে কাজ হয়েছে। এখন চলছে তৃতীয় পর্যায়ের কাজ। এই পর্যায়ে ১৭টি প্রকল্পে সদর উপজেলার বিনয়কাঠি, কীর্ত্তিপাশা ও রাজাপুরের সাতুরিয়া ইউনিয়নে ২৬ কিলোমিটার খাল খননের জন্য ১ কোটি ৯২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ আছে আরও ২ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ১৪টি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে বিনয়কাঠি ইউনিয়নের ছয়টি খালে সাত কিলোমিটার খনন করতে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের ছয়টি খালে ১১ কিলোমিটার খনন করতে ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রাজাপুরের সাতুরিয়া ইউনিয়নে চারটি খালে আট কিলোমিটার খননকাজের জন্য ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই কাজের অগ্রগতি ৩০ শতাংশ।
নির্দেশনানুযায়ী প্রতিটি প্রকল্প ইউনিয়নভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি বাস্তবায়ন করবে। এই সমিতির আওতায় কর্ম এলাকার হতদরিদ্রদের নিয়ে ২৫ জন করে একাধিক এলসিএস কমিটি মাঠপর্যায়ে খাল খনন করবে।
১৬ এপ্রিল বিনয়কাঠি ইউনিয়নে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সমিতির কার্যালয় বা সাইনবোর্ড নেই। প্রকল্পের অধিকাংশ খাল না কেটে পাড় ছেঁটে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। মনে হয় খাল কেটে চওড়া করা হয়েছে। খালের দুই পাড়ে মাটির কোনো অস্তিত্ব নেই। এলাকার হতদরিদ্রদের দিয়ে খাল কাটানোর কথা থাকলেও যশোর, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরা থেকে শ্রমিক আনা হয়েছে।
বিনয়কাঠির বহরমপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা একরাম আলী মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জানতে চেয়েছি, এ কাজে কত টাকা বরাদ্দ, কী জন্য এ কাজ করা হচ্ছে। এর উত্তরে কমিটির লোকজন বলেছেন, আপনাদের জমি আবাদের জন্য সেচের সুবিধা দিতে খাল কাটা হচ্ছে। এ জন্য ওপর থেকে খাইতে খাইতে এখন লামছাম কিছু টাকা আইছে। তা দিয়েই যেটুকু কাজ হয়। এতে বিঘ্ন ঘটালে আপনাগো খাল হবে না।’
সাতক্ষীরার মাটি কাটার শ্রমিক হাসেম আলী বলেন, ‘আমাদের ৩০ জন শ্রমিককে চুক্তিতে সমিতির লোকজন মাটিকাটার জন্য এনেছেন। এ জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়।’
আশিয়ার মুরাসাতা পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসন বলেন, ‘আমাদের ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের কাজ সবাই দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগ সঠিক নয়।
১৭ এপ্রিল কেওড়া ইউনিয়নে দেখা গেছে, সারেংগল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতির বাড়িসংলগ্ন একটি খাল এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটিকে প্রকল্পের মডেল দেখিয়ে পাড়ে সামান্য কিছু মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
কেওড়া ইউপি সদস্য মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির মাধ্যমে খাল কাটার নামে দুই পাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার ও পাড় ছাঁটাই করা হয়েছে। খাল খনন বলতে কিছু করা হয়নি।
সমিতির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি সঠিকভাবে কাজ করেছি।’
সদরের কীর্ত্তিপাশা, রাজাপুরের সাতুরিয়া, নলছিটির কুশাঙ্গলসহ বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরেও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে।
জানতে চাইলে এলজিইডির ঝালকাঠি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম সরকার বলেন, অনিয়মের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক আনার কোনো সুযোগ নেই। যদি এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।