কক্সবাজারের টেকনাফে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সলিম উল্লাহ (৩৬) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। র্যাবের দাবি, নিহত সলিম ইয়াবা ব্যবসায়ী ও মাদকবিরোধী মামলার পলাতক আসামি ছিলেন। তিনি টেকনাফ পৌরসভার ইসলামাবাদের ধুমপেরাংবিলের বাসিন্দা।
র্যাবের ভাষ্য, সলিম ও তাঁর স্ত্রী মিলে দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এনে বাড়িতে মজুত করে ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালীর ঝাউবাগান এলাকায় টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে এ ঘটনা ঘটে। র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের টেকনাফ ক্যাম্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট (বিএন) মির্জা শাহেদ মাহতাব প্রথম আলোকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ইয়াবা পাচার করার জন্য টেকনাফের বাহারছড়ার উত্তর শীলখালী এলাকায় অবস্থান নিয়েছে—এই তথ্য পেয়ে টেকনাফে ক্যাম্পের একদল র্যাব সদস্য অভিযানে গেলে প্রথমে মাদক কারবারিরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় র্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়েন। একপর্যায়ে কয়েকজন মাদক পাচারকারী সুকৌশলে পিছু হটে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজন মাদক কারবারিকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র্যাবের দুজন সদস্যও আহত হন। পরে ওই এলাকা থেকে দুটি দেশীয় অস্ত্র (এলজি), তিনটি তাজা গুলি, চারটি খালি খোসা ও ১০ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ মাদক কারবারিকে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক প্রণয় রুদ্র প্রথম আলোকে বলেন, রাত তিনটার দিকে র্যাব সদস্যরা তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে এলে সলিম উল্লাহ নামের একজন মাদক ব্যবসায়ী মারা যান। আহত দুই র্যাব সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিহত ব্যক্তির শরীরে পাঁচটি গুলির চিহ্ন দেখা গেছে।
মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, গত ২৭ এপ্রিল টেকনাফের ইসলাবাদ ধুমপেরাংবিলের বসতঘরে অভিযান চালিয়ে দুই লাখ ইয়াবা বড়িসহ নিহত সলিম উল্লাহর স্ত্রী সাবেকুন নাহারকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। ওই সময় কৌশলে সলিম উল্লাহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। র্যাবের দায়ের করা মামলায় তিনি পলাতক আসামি ছিলেন।
টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ বি এম এস দোহা বলেন, লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সলিম এক যুগ আগেও পেশায় ছিলেন পানের দোকানদার। দোকানে মিয়ানমারের আচারসহ রকমারি পণ্য বিক্রি করতেন। ২০০৮ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের সুধাপাড়ার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনোয়ারের মেয়ে সাবেকুন নাহারের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের এক বছরের মধ্যে পানের দোকানদার সলিমের আমূল পরিবর্তন হতে শুরু করে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিয়ের পরপরই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে যান সলিম। হঠাৎ করে টেকনাফ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামাবাদ (ধুমপেরাংবিলে) ৩৫ লাখ টাকায় ৫০ শতাংশ জমি কেনেন। বানান দোতলা আলিশান বাড়ি। এর পাশাপাশি টিনশেড সেমিপাকা আরেকটি বাড়িও নির্মাণ করেন। একটি মোটরসাইকেল ও একটি নোয়া মাইক্রোবাসের মালিক ছিলেন সলিম। দোতলা বাড়ির নিচতলায় বসবাস করলেও আরও ছয়টি ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছেন। এ বাড়ির আড়ালে চলছিল রমারম ইয়াবা ব্যবসা। প্রতিদিন তাঁর এ বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের লোকজনের আসা-যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সন্দেহ জন্ম নেয়। অবশেষে ইয়াবার একটি বড় চালানসহ তাঁর স্ত্রী সাবেকুন নাহার গ্রেপ্তার হন র্যাব-১৫–এর একটি বিশেষ দলের কাছে।
গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এ নিয়ে র্যাব-পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ ও এলাকায় মাদকের প্রভাব বিস্তারসহ বিভিন্ন ধরনের ঘটনায় কক্সবাজার জেলায় ১২৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একজন রোহিঙ্গা নারীসহ ২৬জন রোহিঙ্গাও রয়েছেন।